ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান: জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে স্পষ্টতার প্রয়োজন
- ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৫২
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার বিষয়টি ঐতিহাসিক সত্য। এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এটাও ইতিহাসের অংশ যে, ভারত তখন কেবল মানবিক বা নৈতিক দায়িত্ব থেকেই সহযোগিতা করেনি—তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও এতে জড়িত ছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দুর্বল করা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত চিন্তাও এই সহযোগিতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
অন্যদিকে, তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যর্থতা, গণতান্ত্রিকভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি এবং পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও নিপীড়নই মূলত বাংলাদেশের জনগণকে স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ২৭ শে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা বাংলাদেশের মানুষকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে। প্রবাসী সরকার গঠন, বিদ্রোহী বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত সংগ্রামে একটি জাতির জন্ম হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পরাজয়ের পরপরই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দেয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের সময়কালে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারণে ভারতের প্রভাব ছিল—এমন ধারণা সমাজে বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়। এই প্রেক্ষাপট থেকেই “সার্বভৌমত্ব”, “স্বাধীনতা” ও “জাতীয় স্বার্থ” প্রশ্নগুলো রাজনৈতিকভাবে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”-এর ধারণা সামনে আনেন, যা মূলত একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করার রাজনৈতিক দর্শন। এই দর্শনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সবসময় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে সম্পর্ককে বাস্তববাদী কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ ও সমতার ভিত্তিতে দেখতে চেয়েছে—যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু আধিপত্য নয়; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নয়।
বিগত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকের দৃষ্টিতে, এই নির্বাচনগুলোতে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থান শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি স্পষ্ট সমর্থনের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায় এবং একটি নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় রাখাকে নিজেদের স্বার্থের জন্য সুবিধাজনক মনে করে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জনগণের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্পষ্টভাবে দাঁড়িয়েছে—ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন পথে যাবে? বিশেষ করে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য সরকার ক্ষমতায় এলে ভারতের সাথে সম্পর্কের কাঠামো কী হবে?
বিএনপির সমর্থকগোষ্ঠী এবং সাধারণ জনগণ ঐতিহাসিকভাবে বিএনপিকে একটি জাতীয়তাবাদী, সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখে এসেছে।
তাই তারা স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায়—
• ভারতের সাথে সম্পর্ক কি হবে সমতার ভিত্তিতে?
• জাতীয় স্বার্থ কি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে?
• বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কি কেবল ভারতের ট্রানজিট ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হবে, নাকি পারস্পরিক লাভের ন্যায়সংগত কাঠামো তৈরি হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি রাজনৈতিকভাবে সুস্পষ্ট না হয়, তাহলে জাতীয়তাবাদী ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সম্প্রতি বিএনপির কিছু নেতার বক্তব্য এই বিষয়কে আরও জটিল করেছে এবং দলের সমর্থকদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপির হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট, দায়িত্বশীল ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিভিত্তিক অবস্থান ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি। এই অবস্থান হতে পারে এমন—
1. বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, কিন্তু আধিপত্যবর্জিত নীতি: ভারত বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র হবে, কিন্তু কোনোভাবেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নির্বাচন ব্যবস্থা বা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।
2. সমতার ভিত্তিতে কূটনীতি: ছোট-বড় রাষ্ট্রের মানসিকতা নয়, বরং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালিত হবে।
3. জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার: ট্রানজিট, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু—সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রথম স্থানে রাখা হবে।
4. জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতি শ্রদ্ধা: বাংলাদেশের সরকার গঠিত হবে জনগণের ভোটে, কোনো বহির্দেশীয় সমর্থন বা প্রভাবের মাধ্যমে নয়।
বাংলাদেশের জনগণ ভারতবিরোধী নয়, কিন্তু আধিপত্যবিরোধী। তারা সহযোগিতা চায়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ চায় না। তারা বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু পরাধীনতা চায় না।
এই কারণেই, আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির পক্ষ থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে একটি সুস্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক নীতিগত ঘোষণা শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়—বরং এটি একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
কারণ বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়—এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়। আর এই আত্মপরিচয় রক্ষাই যেকোনো জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী ফোরাম, নিউইর্য়ক (যুক্তরাষ্ট) ও প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, জিয়াউর রহমান স্টাডি সার্কেল, যুক্তরাষ্ট ইনক্