ডা. শফিক

যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা

জামায়াতের আমীর

আজ এখানে তো কাল ওখানে। বস্তি থেকে অভিজাত, ধনী থেকে গরীব-সবাই যেন তার কাছে সমান। কখনো নগরের অলিগলি আবার কখনো গ্রামের মেঠোপথে। কী দিন কী রাত? সবই যেন মিলেমিশে একাকার। যেখানেই ছুটে যাচ্ছেন তিনি, তাকে দেখতে আসছে মানুষ বানের স্রোতের মত। ছুটে আসা এসব মানুষের নেই কোনো বয়সের ফারাক, নেই কোনো শ্রেণী বিবেদ কিংবা বৈষম্যের হিসেব। শুভ্র সফেদ এ মানুষটিকে ঘিরে যেন কারোই কৌতুহলের কমতি নেই। শিশুদের কাছে তো আরো এক ধাপ এগিয়ে। কারণ তাদের নিকট সাদা দাদু হিসেবে পরিচিত তিনিও শিশুদের কোলে তুলে নিচ্ছেন স্বস্নেহে। মমতার আত্মিক বন্ধনে বাহুডোরে বাঁধছেন তাদের। বিশেষ করে শহীদ পরিবারগুলোর সাথে দেখা করার দৃশ্যগুলো যেন ভিন্ন আবহের সৃষ্টি হয় তার আগমনে। তাই যেখানেই তিনি যাচ্ছেন, তার আগমনের খবরে শিশু থেকে আবাল-বৃদ্ধ বনিতা-সবাই ছুটে আসছেন পঙ্গপালের মত। তিনি আর কেউ নন। ডা. শফিকুর রহমান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর। সব চাপিয়ে সত্যিই তিনি যেন এ যুগের নতুন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তার এমন অসম্ভব প্রানােচ্ছ্বল ও তারুন্যদীপ্ত ছুটে চলায় মানুষের ছুটে আসাকে জার্মান লোককথার সেই বিখ্যাত 'দ্য পিয়েড পিপার অব হ্যামিলন'র গল্পকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরামহীন প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান। গত ২২শে জানুয়ারি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে সারা দেশে চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। সকালে আকাশ পথে হলে বিকালে স্থলপথ, আবার কখনো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সড়ক পথে লাগাতার নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। দলীয় প্রধানের এমন ক্লান্তিহীন ছুটে চলায় উজ্জীবিত দলটির নেতাকর্মী-সমর্থকরা। প্রচারণায় ব্যাপক সাড়া পেয়ে নিজেও উচ্ছ্বসিত জামায়াত আমীর। গতকাল এক ফেসবুক পোস্টে তিনি নিজের নির্বাচনী সফরের অজ্ঞিতা তুলে ধরেন। বলেন, বিপুল মানুষের সাড়া দেখে তিনি অভিভুত। দেশের নারী পুরুষ সবাই আওয়াজ তুলেছেন তারা পরিবর্তন চান এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান। দেড় দশকেরও বেশি সময় প্রতিকূল পরিবেশে থাকা দলটির বর্তমান আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী লড়াইয়ে দলটি। রাজধানীর ঢাকা-১৫ (মিরপুর-কাফরুল) থেকে নিজে প্রার্থী হয়েছেন। এই আসন থেকেই ২২শে জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচার কাজের সূচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। পরদিন ছুটে যান দেশের উত্তরাঞ্চলে। দুইদিনের সফরে জামায়াত আমীর পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার ডজনখানেক নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রাখেন। তিনি ক্ষমতায় গেলে উত্তরাঞ্চলকে কৃষি শিল্পের রাজধানীর ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দেন। প্রায় ১৭ বছর পর অনুকূল পরিবেশে এসব সমাবেশে ব্যাপক জনসমাগমও ছিল। দুইদিনের সফর শেষে একদিন ঢাকায় অবস্থান করেই জামায়াত আমীর ২৭শে জানুয়ারি ফের দুইদিনের সফরে যান দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে।

এ সময় তিনি কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা সফরকালে অন্তত ১০টি নির্বাচনী প্রচার সভায় বক্তব্য রাখেন। ঢাকায় ফিরে এসে পরদিন জামায়াত আমীর বৃহত্তর নোয়াখালী, কুমিল্লা সফরে যান এবং একের পর এক নির্বাচনী প্রচার সভায় অংশ নেন। শনিবার সফর শেষে ফের ঢাকায় পৌঁছে তিনি কেরানীগঞ্জ, ধানমণ্ডি কলাবাগান এবং মিরপুরে তিনটি নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রাখেন। রাজধানীতে রাত্রি যাপন শেষে রোববার সকালে আকাশ পথে ছুটে যান শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায়। সেখানে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করীমের কবর জিয়ারত করেন ডা. শফিকুর রহমান। শেরপুর- জামালপুরের দুইটি নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে জামায়াত আমীর ফিরে আসেন রাজধানীতে। অংশ নেন মিরপুরে নিজের নির্বাচনী এলাকায় জনসংযোগে। রাতে নির্বাচনী জনসংযোগ শেষে আজ (সোমবার) সকালে জামায়াত আমীর ছুটে গেছেন কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চল সফরে। এ সফরে কক্সবাজারের মহেশখালী, কক্সবাজার শহর, লোহাগাড়া, সীতাকুণ্ড এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিবেন।

আগামী ৯ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জামায়াত আমীরের এমন ধারবাহিক কর্মসূচি আছে বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। 
গত বছরের আগস্টে জামায়াত আমীরের ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে। এরপর কিছুদিন তিনি বিশ্রামে ছিলেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠার পর থেকে তিনি ফের দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত হন। প্রচার-প্রচারণায়ও জামায়াত আমীর প্রতিপক্ষের বিভিন্ন বক্তব্যের জবাব দিচ্ছেন সাবলীল ভাষায়। তার এমন সহজ সরল ভাষা ও বক্তব্যে আকৃষ্ট হচ্ছেন সাধারণ মানুষও।

এদিকে দলীয় প্রধানের এই নিরলস প্রচার-প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ জামায়াতের ২১৫ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। তারাও নিজ নিজ আসনে দিন-রাত সক্রিয় রয়েছেন প্রচারণায়। 

ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণে ৭টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৫টিতে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। দিন-রাত তারা পাড়া-মহল্লা, অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন। নিজ নিজ সংসদীয় এলাকার বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরছেন প্রার্থীরা। নিজ দলের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট চাওয়ার পাশাপাশি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতেও ভোটারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।
ঢাকা-৪ আসনে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন দিনভর দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে পাড়া-মহল্লায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে গণসংযোগ অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় তিনি এলাকার গ্যাস সংকট, জলাবদ্ধতা, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে ঢাকা-৪ সংসদীয় এলাকাকে শান্তির নীড় হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

ঢাকা-৫ আসনে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন বুধবার ধোলাইপাড় সার্কেল অফিসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগে সকল প্রার্থীদের সঙ্গে আয়োজিত বৈঠকে যোগদান করেন। বিকালে ডেমরা বাজারে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে মিছিল শেষে গণসংযোগ অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় তিনি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত ড্রেনেজ সমস্যার সমাধান ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
ঢাকা-৬ আসনে ১১ দলীয় জোট-সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান পাটুয়াটুলি মসজিদে জোহরের নামাজ শেষে স্থানীয়দের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। পরে তিনি বিভিন্ন এলাকায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে গণসংযোগ করে লিফলেট বিতরণ করেন। বিকালে কোতোয়ালির বাদামতলী মদিনা ফল মার্কেটের সামনে অনুষ্ঠিত পথসভায় বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি বাজারের ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে ফুটপাথ কিংবা শপিংমলে ব্যবসা করতে কাউকে এক পয়সাও চাঁদা দিতে হবে না। পরে বাহাদুর শাহ পার্ক, সোহ্‌রাওয়ার্দী কলেজ গেট ও সূত্রাপুর এলাকায় তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে গণসংযোগ করেন। এ সময় তিনি স্থানীয়দের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে আজকের মতো আগামীতেও জনগণের মাঝেই থাকবেন। জনগণের যেকোনো সমস্যা নিজের সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এলাকার সব সমস্যা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা হবে।

ঢাকা-৭ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী হাফেজ এনায়েত উল্লাহ উর্দু রোড, ডিসি রায় রোড, আরমানিটোলা, বাবুবাজার, ইসলামপুর এলাকায় গণসংযোগ অভিযান পরিচালনা করেন। পরে বাদামতলী, ইসলামপুরের জব্বু খানম মসজিদ ও নবরায় লেনে গণসংযোগ শেষে পথসভায় বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, পুরান ঢাকা হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের নগরী। এখানকার ব্যবসায়ীরা বিগত ৫৪ বছর ক্ষমতাসীন দল দ্বারা শোষিত হয়েছে। যখন যারা ক্ষমতায় বসেছে তখন তারা ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে চাঁদা আদায় করেছে। তিনি নির্বাচিত হলে আগামীতে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কেউ এক টাকাও চাঁদা নেয়ার সুযোগ পাবে না। তিনি বলেন, জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিতেই তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। তিনি নির্বাচিত হলে প্রথম কাজ হবে জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

ঢাকা-১০ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী এডভোকেট মো. জসীম উদ্দীন সরকার ধানমণ্ডি লেক পাড়, কামরাঙ্গীরচর এলাকায় গণসংযোগ অভিযান পরিচালনা করেন। পরে হাজারীবাগ টালী অফিস রোডে গণসংযোগ শেষে স্থানীয়দের সঙ্গে উঠান বৈঠক করেন। পরে হাজারীবাগ শেরেবাংলা রোডে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে একটি সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ থেকে বৈষম্যের শিকল ভেঙে দিয়ে একটি সুখী-সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করাই জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য। তিনি নির্বাচিত হলে ঢাকা-১০ সংসদীয় এলাকা হবে সম্প্রীতির বাংলাদেশের এক মডেল শহর। পরে তিনি লেদার কলেজ স্টাফ কোয়ার্টার মসজিদ-সংলগ্ন এক হলরুমে রিকশা শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি রিকশা শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, জনগণের ভালোবাসা, সমর্থনে তিনি নির্বাচিত হলে রিকশাচালকদের জীবনমান উন্নয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ঢাকা-১০ সংসদীয় এলাকায় একজন বাড়িওয়ালা ও একজন রিকশাচালক নাগরিক হিসেবে সমান সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদার অধিকারী হবেন। তাই নিজেদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আগামী নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেয়ার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে তিনি রিকশা শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

সবমিলিয়ে এই বয়সেও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের এমন ক্লান্তিহীন ছুটে চলা সবাইকে রীতিমত অবাক করে দিয়েছেন। তারা বলছেন, জনগনের ম্যান্ডেট পেলে জামায়াত যে দেশ পরিচালনায়ও এমন ক্লান্তিহীন হবেন, তার উদাহরণও দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমান।