ডা. জুবাইদার ‘কোমল কূটনীতি’
- ২২ জুন ২০২৬, ২২:০২
কূটনীতি মানেই কি শুধু গম্ভীর মুখে সুট-টাই পরে লালগালিচায় হাঁটা, কিংবা রুদ্ধদ্বার কক্ষে ফাইলপত্রের খসড়া বিনিময়? দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতি-প্রকৃতির অভিজ্ঞতায় বলা যায়—সবচেয়ে কঠিন বরফগুলো গলে যায় যখন সেখানে মানবিক ছোঁয়া লাগে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় একে বলা হয় 'সফট ডিপ্লোম্যাসি' বা কোমল কূটনীতি। ঠিক তেমনই এক রাজকীয় অথচ দারুণ মানবিক ও আন্তরিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রাজায়া। যেখানে মূল আলোচনার টেবিল ছাড়িয়ে দুই দেশের মৈত্রীর গল্পটি লেখা হলো হ্রদের নীল জল আর বাটিকের চেনা ক্যানভাসে।
মালয়েশিয়া সফরের ফাঁকে গতকাল সোমবার পুত্রাজায়ায় সৌজন্য ও আন্তরিকতার এমনই এক ভিন্ন অধ্যায় দেখা গেল। শহরের দাঁতারান পেরদানায় আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা পর্ব শেষ হওয়ার পর ভিন্ন এক আয়োজনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
সকাল সাড়ে ৯টায় তাকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী দাতুক সেরি ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মন্ত্রী হান্না ইয়োহ। বিশেষ করে তখন, যখন সকালের মিঠে রোদ এসে পড়েছে পুত্রাজায়ার আইকনিক গোলাপি মসজিদের মিনারে। প্রায় এক ঘণ্টার এ সৌজন্য সফরে তারা পারস্পরিক আলাপচারিতার পাশাপাশি উপভোগ করেন পুত্রাজায়ার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
প্রথমেই ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল ডা. জুবাইদাকে নিয়ে যান লেক ক্রুজে। পানির বুকে ভেসে পুত্রজায়ার চারপাশের নান্দনিক স্থাপনা ও সবুজে ঘেরা দৃশ্য উপভোগ করেন তাঁরা। পুত্রাজায়া লেক ক্রুজে ভ্রমণ করে নৌপথে উপভোগ করেন প্রশাসনিক শহরের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
এর আগে রবিবার রাতে দুই দিনের সরকারি সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান। এ সফরের মূল লক্ষ্য দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো শক্তিশালী এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা।
পরে পুত্রজায়া কমপ্লেক্স সেরি পেরদানায় মালয়েশিয়ান ক্রাফটাঙানের আয়োজনে বাটিক খোদাইয়ের প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীরা। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের নানা ধাপ ও রঙের ব্যবহার তুলে ধরা হয় তাঁদের সামনে।
এখানে শুধু দর্শক হয়ে দেখাতেই থেমে থাকেননি ডা. জুবাইদা। বাটিকের রঙে নিজেও অংশ নেন সৃজনশীল সেই আয়োজনে। তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন নিজের শিল্পবোধের ছাপ, যা উপস্থিতদের নজর কাড়ে। বিদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক ব্যস্ততার মাঝেও শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহের এক অনন্য মুহূর্ত হয়ে ওঠে এ আয়োজন। সব মিলিয়ে মুখর হয়ে ওঠে পুত্রাজায়ার লেক ক্রুজে।
প্রায় এক ঘণ্টার এই নৌ-ভ্রমণ কেবল জলযানে ঘুরে বেড়ানো ছিল না। পানির বুকে ভেসে ভেসে যখন তাঁরা মালয়েশিয়ার দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য আর সবুজের সমারোহ দেখছিলেন, তখন দুই দেশের এই দুই শীর্ষ নারীর আলাপচারিতায় উঠে আসছিল পরিবার, সমাজ আর দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প। যাঁরা ইতিহাসের বাঁক বদলগুলো দেখেছেন, তাঁরা ভালো করেই জানেন, প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তির শক্ত ভিত তৈরি হয় মূলত এ ধরনের আত্মিক ও পারিবারিক বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করেই।
নৌ-ভ্রমণ শেষে ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে যাওয়া হয় পুত্রজায়া কমপ্লেক্স সেরি পেরদানায়, যেখানে অপেক্ষা করছিল মালয়েশিয়ার গর্ব—ঐতিহ্যবাহী বাটিক শিল্পের এক জমকালো প্রদর্শনী। সেখানে গিয়ে কেবল একজন দর্শক বা অতিথি হয়ে হাততালি দেওয়ার চেনা বৃত্তে আটকে থাকেননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী। একজন সফল চিকিৎসক এবং সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে তাঁর ভেতরের শৈল্পিক সত্তাটি যেন জেগে উঠেছিল। তিনি নিজেই হাতে তুলে নিলেন শিল্পীর তুলি। মালয়েশিয়ার কারিগরদের পাশে বসে, তাঁদেরই একজন হয়ে কাপড়ের ক্যানভাসে মেলালেন রঙের খেলা। বাটিকের কাপড়ে ডা. জুবাইদা রহমানের সেই তুলির আঁচড় কেবল রঙের উৎসব ছিল না, ওটা ছিল দুই দেশের সংস্কৃতির এক নীরব অথচ শক্তিশালী কোলাকুলি। উপস্থিত মালয়েশিয়ান শিল্পী ও কর্মকর্তারা বাংলাদেশের এই শীর্ষ নারীর এমন সাধারণ ও আন্তরিক আচরণে আপ্লুত হয়ে পড়েন। দেশটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই ছবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীরা বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডির এই অমায়িক রূপের ভূয়সী প্রশংসা করছেন।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে দেখতে গেলে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দুই দিনের সরকারি সফরের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিদেশ সফর। এই সফরে ইতিমধ্যে দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়, যৌথ নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। বিশেষ করে, সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা—বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত করার বিষয়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে, যা আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও অর্থনীতিকে আরো চাঙ্গা করবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আসিয়ানের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার জোরালো সমর্থনের প্রতিশ্রুতিও মিলেছে।
সব আনুষ্ঠানিকতার বাইরে, সোমবার বিকেলে চীনের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া ত্যাগের আগে ডা. জুবাইদা রহমানের এই আন্তরিক আতিথেয়তা এবং মানবিক কূটনীতি কুয়ালালামপুরকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেল—বাংলাদেশ কেবল একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং তারা এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও মার্জিত মননের দেশ। আর মালয়েশিয়াও প্রমাণ করল, ঢাকাকে তারা কেবল ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে নয়, হৃদয়ের খুব কাছের এক পরম বন্ধু হিসেবেই পাশে রাখতে চায়।