এক ঢিলে দুই পাখি শিকার

দিল্লীর নীল নকশায় গাইবান্ধায় রাম মন্দির

রাম মন্দির

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আকস্মিকভাবে ৮১ ফুট উচ্চতার বিশালাকার রাম মূর্তি ও রাম মন্দির নির্মাণের তোড়জোড় কেবল ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে ভারতের অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ভূকৌশলগত স্বার্থ। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত এই মন্দির নির্মানকে কেন্দ্র করে এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের ফাঁদ পেতেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশি ভারত। এরমধ্যে দেশটি একদিকে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সংযুক্তকারী কৌশলগত করিডোর ‘চিকেন নেক (শিলিগুড়ি করিডোর)-কে আরও বিস্তৃত ও সুরক্ষিত করার এক প্রচ্ছন্ন নীল নকশা হিসেবে কাজ করছে এই প্রকল্প। অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের সুবিধাভোগী একটি মহল এই ঘটনাকে পুঁজি করে দেশব্যাপী একটি বড় মাপের অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টার এক নতুন ফন্দিতে লিপ্ত, যার মূল উদ্দেশ্য বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে ইসলামী দলগুলোকে রাজনীতির মাঠে কোনঠাসা করা। ফলে সীমান্ত সংলগ্ন এই সংবেদনশীল অঞ্চলে দিল্লির মদদে এই ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। 

সামরিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ভূকৌশলগত প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ভারতের চিকেন নেক ও উত্তরবঙ্গকে ঘিরে এক কঠিন পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে দিল্লি। তাই বিজেপি সরকারের নজর এখন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুর ও দিনাজপুরের দিকে। কারণ, ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন নেক’ ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ভঙ্গুর। মাত্র ২১ থেকে ৪০ কিলোমিটার প্রস্থের এই সংকীর্ণ ভূমি খণ্ডটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যকে (সেভেন সিস্টার্স) যুক্ত করেছে। চীনের সামরিক চাপ কিংবা যেকোনো বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতের মুহূর্তে এই করিডোরটি অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় দিল্লি সর্বদা তটস্থ থাকে। এই বাস্তবতায়, কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ভারত বরাবরই বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চল তথা সমগ্র উত্তরবঙ্গের ওপর নিজের একচ্ছত্র মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ নিয়ে নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরাও বিষয়টির পরম্পরা ও তার ব্যাপ্তি নিয়ে তাদের উদ্বগের কথা জানান। 

জানতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেসের সহকারী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের (বিডস) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান হোসাইন আনসারী বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের পরে চিকেন নেক নিয়ে ভারতের এক ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। সেই উদ্বেগের বিষয়টি ভারতীয় গণমাধ্যমে আমরা বিভিন্নভাবে উপস্থাপিত হতে দেখেছি এবং চিকেন নেকের এই থ্রেটকে মোকাবিলা করার জন্য ভারত তার ইস্টার্ন কমান্ডকে শক্তিশালী করার সংবাদও বেরিয়েছে। তাদের বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এই ইস্টার্ন কমান্ডের কি ধরনের শক্তিমত্তা এ নিয়ে এক ধরনের ডিটারেন্স বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা এক ধরনের থ্রেট হিসেবে বাংলাদেশের সামনে হাজির হচ্ছে। পাশাপাশি চিকেন নেকের এ থ্রেটকে মোকাবিলায় রংপুর অঞ্চলকে ভারতের সাথে একীভূত করতে ভারতীয় গণমাধ্যমে একটি রেটরিক বা ন্যারেটিভও ডেভেলপ করা হচ্ছে। 

ড. ইমরান আনসারী বলেন, এমন বাস্তবতায় রংপুর অঞ্চলে একটি বিরাট আকৃতির রাম মন্দির নির্মান যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রাখে। কারণ এ মন্দিরকে কেন্দ্র করে সেখানে তারা একটি তীর্থস্থান করার চেষ্টা করছে যেখানে এক ধরনের ব্যাপক জনসমাগম হয়। সেজন্য এর পেছনে কি রহস্য বা পরকিল্পনা রয়েছে এ নিয়ে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাকে বিষয়টিকে গভীর নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে এ মন্দিরকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের জাতিগত সংঘাত দানা বেঁধে উঠতে না পারে।

মূলত গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর কোমরপুর গ্রামে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের একেবারে কোল ঘেঁষে এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়জ্ঞান এবং স্থান নির্বাচনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। স্থানীয়রা জানান, এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা হরিদাস বাবু (সাবেক নাম তৌহিদ ইসলাম) দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থান করার পর রহস্যজনকভাবে বিপুল অর্থের মালিক হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এরপরই তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট আয়ের উৎস প্রদর্শন ছাড়াই একের পর এক বিশাল ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেন, যার মধ্যে ২০১৫ সালে ৫৩ ফুট উচ্চতার শ্রীকৃষ্ণ মূর্তি এবং বর্তমানের ৮১ ফুট উচ্চতার বিতর্কিত রাম মূর্তি প্রকল্প অন্যতম। অভিযোগ উঠেছে, এই বিপুল অর্থের জোগান সরাসরি এসেছে ভারতীয় সীমান্ত ও কূটনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে। ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের এই নির্দিষ্ট পয়েন্টটি এমন একটি নোডাল পয়েন্ট, যা কাট-অফ বা অবরুদ্ধ করলে সমগ্র রংপুর বিভাগ ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। 

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দিল্লি মূলত তাদের চিকেন নেক করিডোরের কৌশলগত গভীরতা বা ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে প্রসারিত করার একটি অদৃশ্য ঢাল তৈরি করছে।

বিশেষ করে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও রংপুরের এই বেল্টটি তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবাপন্ন এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা। এই অঞ্চলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা মাত্র ৭ থেকে ৯ শতাংশ। এই বাস্তবতায়, হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল পরিহার করে সম্পূর্ণ সচেতনভাবে উত্তরবঙ্গের এই মুসলিম প্রধান ও ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে একটি স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের বীজ বপন করা যায়।

এই মূর্তি নির্মান শুরুর পরপরই এ নিয়ে ঐতিহাসিক বির্তকের শুরু হয় যার রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও সংখ্যাগত উপাত্তের গরমিল দেখা দেয়। কারণ বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির নির্মাণের ইতিহাস ও পরম্পরা অত্যন্ত প্রাচীন এবং তা মূলত সহনশীল বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ হাজারেরও বেশি স্থায়ী ও অস্থায়ী মন্দির রয়েছে। তবে ঐতিহাসিকভাবেই এই মন্দির ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর সিংহভাগ গড়ে উঠেছে সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত অঞ্চল যেমন—গোপালগঞ্জ, খুলনা, যশোর, দিনাজপুর, বরিশাল, সিলেট এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে। ঐতিহাসিকভাবে যেসব এলাকায় সনাতন ধর্মের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, সেখানে হঠাৎ করে ভারতের অযোধ্যার আদলে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মূল প্রতীক ‘শ্রীরামচন্দ্র’-এর এত বড় মূর্তি স্থাপনের ঐতিহাসিক বা সামাজিক কোনো পরম্পরা নেই।

সূত্র জানায়, গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে দেশের সর্ববৃহৎ রাম মন্দির নির্মানের পেছনে বিরাট এক রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি। মূলত সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক দলগুলো যে কয়টি অঞ্চলে তুলনামুলক ভালো করেছে তার মধ্যে গাইবান্ধা অন্যতম। ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলে উদারপন্থী বিএনপি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান মজবুত। সেজন্য এ অঞ্চলে দলটির জনপ্রিয়তা ও শক্তিশালী অবস্থানকে কোনঠাসা করতেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অস্থিতিশীলতার ছক অনুযায়ীই সেখানে এমন একটি বির্তকিত ইস্যুর জন্ম দেওয়া হয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই রাম মন্দির ও রাম মূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক জটিল ও বিপজ্জনক খেলা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ভারতের আজ্ঞাবহ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দেশের শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতিতে ডানপন্থী দল, বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রভাব ও জনসমর্থন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরমধ্যে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল ঐতিহ্যগতভাবেই ইসলামপন্থীদের একটি অন্যতম প্রধান ‘ভোট ব্যাংক’বা শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বর্তমান সংসদের একাধিক আসন এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এই অঞ্চলের ধর্মীয় ভাবাপন্ন ভোটারদের ওপর নির্ভরশীল।

ভারতের নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সাবেক প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, "ভারত তার শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে সর্বদা এক ধরনের সামরিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। গাইবান্ধার এই কৌশলগত পয়েন্টে ভারতের প্রভাব বলয় তৈরি করতে পারলে তা দিল্লির জন্য একটি বড় ভূকৌশলগত সুবিধা দেবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর দিল্লি এখন বাংলাদেশে তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ফ্রন্ট ব্যবহার করছে। উত্তরবঙ্গের ইসলামী দল অধ্যুষিত বেল্টকে টার্গেট করার মূল কারণ হলো, রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে বর্তমান সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে কোনঠাসা করা। এটি স্পষ্টতই একটি আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক লবির সুদূরপ্রসারী চাল।"

গোয়েন্দা সূত্র এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রাম মন্দির ও বিশালাকার মূর্তি নির্মাণের মাধ্যমে এই শান্ত অঞ্চলটিকে একটি তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত করার ছক কষা হয়েছে। স্থানীয় হিন্দুদের একটি বিশেষ অংশকে প্ররোচিত করে একে পুঁজি করার চেষ্টা চলছে, যাতে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে বড় ধরনের কোনো ধর্মীয় সংঘাত বা প্রতিবাদ ভাঙচুর উসকে দিতে পারলে, আন্তর্জাতিক মহলে ধর্মভিত্তিক সমমনা দলগুলোকে ‘উগ্রপন্থী’ ও ‘সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী’হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা সহজ হবে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ভারতের ভূরাজনৈতিক মদদে চাচ্ছে, রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে একটি ভয়াবহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং দাঙ্গা তৈরি হোক। এর ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে ধর্ম ভিত্তিক দলের রাজনীতিকে সম্পূর্ণ মাইনাস বা নিষিদ্ধ করার একটি মোক্ষম সুযোগ তৈরি হবে। একই সাথে, বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা বিপন্ন—এই অজুহাতে শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন নেকের সুরক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরবঙ্গে ভারতীয় সামরিক বা আধিপত্যবাদী হস্তক্ষেপের একটি পটভূমিও এর মাধ্যমে তৈরি করার দূরভিসন্ধি রয়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব এডভোকেট গোবিন্দ প্রামানিক বলেন, ভারততো তার সীমানায় কাটাতারের বেড়া দেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজের গন্ডির মধ্যেই রয়ে গেছে, দখল করতে আসবে কেমনে? তিনি বলেন, ভারত যদি বাংলাদেশ দখল করতে চায় তাহলে এদেশের হিন্দু লাগবে কেন? কারণ ভারতের সাথে এদেশের বড় বড় রাজনীবিদ ক্ষমতায় বসে বরং এদের সাথে ভারতের সম্পর্ক বেশি। তা না হলে ৫ তারিখের পর বহু হিন্দু ভারতে ঢুকতে চাইলেও তাদের ঢুকতে দেয়নি। বরং শেখ হাসিনা, শেখ হেলাল, শেখ সেলিমসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতাদের ঢুকতে দিয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘আমার জমিতে, আমার টাকায় আমি কি ৫তলা নাকি ১শ তলা মূর্তি বানাবো- এটাতো আমার ধর্মীয় স্বাধীনতা। আপনি কেন বাধা দিচ্ছেন? ‘আমরাতো ঘোষণা দিয়েছি ৬৪ জেলায় ৬৪টি মূর্তি বানাবো। আপনি বাধা দেওয়ার কে? তিনি আরো বলেন, ‘মুসলিমরা একদিকে বলছেন, মূর্তির কোনো ক্ষমতা নাই। এখন যে আবার বলছেন মূর্তি দিয়ে হিন্দুরা গোটা দেশ দখল করে ফেললো। যদি মূর্তির ক্ষমতাই না থাকে তাহলে তো মুসলিমদের ঈমানই নষ্ট হয়ে গেল হয়ে গেল এ ইস্যুতে।’

এদিকে এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাম মন্দির নির্মানের মত এই মেগা প্রকল্পের অর্থায়নের উৎস খতিয়ে দেখতে গিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র ও স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো বৈধ কর্পোরেট স্পন্সরশিপ বা উন্মুক্ত ক্রাউডফান্ডিং ছাড়াই কোটি কোটি টাকার এই কর্মযজ্ঞ চালানো হচ্ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ভারতের উত্তর প্রদেশভিত্তিক কয়েকটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী ট্রাস্ট এবং কলকাতার নির্দিষ্ট কিছু ‘এনজিও’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হুন্ডি ও অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত চ্যানেলে এই অর্থ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর কৌশলগত শাখাগুলো এই অঞ্চলের সনাতনীদের একটি বিশেষ অংশকে ‘পলিটিক্যাল টুল’হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। দিল্লির কৌশলগত থিংক-ট্যাংকগুলো উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও কুড়িগ্রামের মতো সীমান্ত জেলাগুলোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে একটি স্থায়ী ‘কালচারাল করিডোর’ তৈরি করতে চায়। ভৌগোলিকভাবে উত্তরবঙ্গ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার যেকোনো আন্তর্জাতিক সমীকরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আর এই কারণেই, এই অঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত পলাশবাড়ীকে বেছে নিয়ে দিল্লি মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মহাসড়ক ও যোগাযোগ লাইনের ওপর একটি পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

এ নিয়ে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী নামে এক হিন্দু ধর্মীয় নেত্রী বাংলাদেশের ভেতরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি আলাদা রাজ্য বা প্রদেশ গঠনের বিষয়ে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ রূপরেখা দিয়ে বক্তব্য দিয়ে ভাইরাল হয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আলাদা প্রদেশ গঠনের রূপরেখার সাথে ভারতের ‘চিকেন নেক’করিডোরকে বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের দিকে বিস্তৃত করার দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনার একটি মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র রয়েছে। তার এই বক্তব্যকে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অখণ্ডতার পরিপন্থী এবং রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকেই। সমালোচকদের দাবি, বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণের আড়ালে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নষ্ট করা বা আলাদা প্রদেশ দাবি করার মতো বক্তব্য কঠোরভাবে দমন করা উচিত। 

জানতে চাইলে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক কপিল কৃষ্ঞ মন্ডল বলেন, ”হিন্দুদের নিয়ে কথা বলে লাভ কি? এ নিয়ে সংসদে আলোচনা হচ্ছে। আপনারা সেখান থেকে সবই জানতে পারছেন। তাই এ ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” 

এদিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর রাম মন্দির বিতর্কটি কেবলই একটি মূর্তির উচ্চতা বা ধর্মীয় স্থাপনার পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বলে মনে করে নাম প্রকোশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য এদিনকে বলেন, গাইবান্ধায় রাম মূর্তি নির্মানের গভীরতা ভারতের ‘চিকেন নেক’সুরক্ষার নামে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে নির্দিষ্ট আদর্শের শক্তিকে মাইনাস করার এক বৃহত্তর আঞ্চলিক চক্রান্তের সাথে জড়িত। বাংলাদেশ সরকারকে কেবল এই নির্মাণকাজ সাময়িক স্থগিত রাখলেই চলবে না। বরং উত্তরবঙ্গের ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির এই বিপজ্জনক খেলা বন্ধ করতে এখনই কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

এই নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে তীব্র জনরোষ তৈরি হলে দিল্লির সাউথ ব্লকের পক্ষ থেকে একটি প্রচ্ছন্ন কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অনানুষ্ঠানিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনালয় সংস্কারের বিষয়, যার সাথে দিল্লির কোনো কৌশলগত সংযোগ নেই। তবে ভারতের কিছু মূলধারার গণমাধ্যমে এই ঘটনাকে "বাংলাদেশে সনাতনীদের ধর্মীয় অধিকার খর্ব ও উগ্রবাদের উত্থান" হিসেবে প্রচার করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, যা দিল্লির দীর্ঘমেয়াদি বয়ান বা ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অপরদিকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পলাশবাড়ীর স্থানীয় জনগণের মধ্যে এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় তৌহিদী জনতা ও সাধারণ মানুষ দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। তারা বলছেন, বাংলাদেশের মানচিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে, ভারতের অযোধ্যার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না। এটি ধর্মীয় ভক্তি নয়, এটি একটি সুনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক আগ্রাসন।" তীব্র প্রতিবাদের মুখে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির আশঙ্কায় গত ১১ জুন মন্দির কমিটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আপাতত এই ৮১ ফুট উচ্চতার রাম মূর্তি নির্মাণকাজ স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, কাজ কেবল সাময়িক স্থগিত নয়, এই রহস্যময় অর্থায়নের উৎস এবং এর পেছনের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। 

এই গভীর ষড়যন্ত্রের বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় আলেম-ওলামাদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বও এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।  

জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আজিজুল হক ইসলামবাদী বলেন, “বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে হাজার বছর ধরে মুসলিম ও হিন্দুরা পাশাপাশি বাস করছে। কিন্তু হঠাৎ করে ভারতের প্রেসক্রিপশনে মুসলিম অধ্যুষিত উত্তরবঙ্গে, যেখানে কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, সেখানে এত বড় রাম মূর্তি নির্মাণের উদ্দেশ্যই হলো উসকানি দেওয়া। এটি স্থানীয় জামায়াতপন্থী ও ধর্মীয় ভাবাপন্ন জনগোষ্ঠীকে খেপিয়ে তুলে দেশে একটি কৃত্রিম দাঙ্গা বাধানোর অপচেষ্টা। আমাদের যুবসমাজকে অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে এই চক্রান্ত মোকাবিলা করতে হবে। কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে নেওয়া যাবে না, যাতে ষড়যন্ত্রকারীরা আমাদের ওপর উগ্রবাদের তকমা লাগাতে পারে।"