যে ভঙ্গি বদলে দিয়েছিল গতিপথ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলির মুখে দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। সেই দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে এবং কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। পরবর্তীতে এই আন্দোলনই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।

আজ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দুই বছর পূর্ণ হলো। তার পরিবার, সহপাঠী ও আন্দোলনের সহযোদ্ধারা এখনও হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ বিচার এবং রায়ের বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন।

আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইতোমধ্যে রায় দিয়েছেন। তবে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় এখনো সেই রায় কার্যকর হয়নি। পরিবার চায়, জীবদ্দশাতেই অভিযুক্তদের শাস্তি কার্যকর হতে দেখার সুযোগ।

আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ১৬ জুলাই

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে রংপুর-কুড়িগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের পার্ক মোড়ে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। সেখানে পুলিশের পাশাপাশি তৎকালীন সরকার সমর্থিত সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল।

দুপুর ২টা ১৩ মিনিটের দিকে পুলিশের টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ ও সংঘর্ষের মধ্যে কালো টি-শার্ট পরা আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের গুলিতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।

সেদিন রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন নিহত হন। এসব ঘটনার পর দেশজুড়ে আন্দোলন আরও বেগবান হয় এবং ছাত্র-জনতার মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

‘আমাকে বাঁচাও’

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সর্বপ্রথম আবু সাঈদের কাছে ছুটে যান শিক্ষার্থী সিয়াম আহসান আয়ান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া এই শিক্ষার্থী বলেন, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আবু সাঈদ তার হাত ধরে বলেছিলেন, ‘আমাকে বাঁচাও।’

আয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আবু সাঈদকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তিনিও গুলিবিদ্ধ হন। পরে অন্যদের সহযোগিতায় আবু সাঈদকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি।

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য ও তদন্তের তথ্য

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুরের অন্যতম সমন্বয়ক ইমরান আহমেদ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে একাধিকবার গুলি করা হয়েছিল।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবু সাঈদ প্রাণঘাতী ধাতব গুলিতে নিহত হন এবং ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যেও উল্লেখ করা হয়, মাত্র ১৪-১৫ মিটার দূর থেকে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য শটগান দিয়ে সরাসরি তার দিকে গুলি ছোড়েন।

মামলার রায়

আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় চলতি বছরের ৯ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাবেক দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।

পরিবারের অপেক্ষা

আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চান তিনি। তার অভিযোগ, ঘটনার রাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত দাফনের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল।

মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ছেলে বাড়িতে এলে সবার খোঁজ নিত, নিয়মিত ফোন করত। এখন সেই ডাক আর শোনা যায় না। তার একমাত্র চাওয়া, হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হোক।

ভাইয়ের আক্ষেপ

আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন, আবু সাঈদের আত্মত্যাগ যেন কোনোভাবেই বিস্মৃত না হয়। তার মতে, শুধু রায় দিলেই হবে না, সেটি কার্যকরও করতে হবে। একই সঙ্গে আবু সাঈদের স্মৃতিরক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তিনি।

‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে আবু সাঈদ

রংপুরের আইনজীবী ও সংগঠক জোবাইদুল ইসলাম বুলেট বলেন, পুলিশের সামনে আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যই জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্টে পরিণত হয়েছিল। তার মতে, বৈষম্য, দুর্নীতি, নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছেন আবু সাঈদ।

তিনি বলেন, শুধু রায় ঘোষণা নয়, সব হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যকর করাই হবে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতি প্রকৃত সম্মান।