সিটি কলেজ কেলেঙ্কারি
- ২০ জুলাই ২০২৬, ২২:৫৩
রাজধানীর ধানমন্ডির ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে আর্থিক ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত একাধিক গুরুতর অনিয়ম, জালিয়াতি ও আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটির অনুমোদিত ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ সরকারি আইন, বিধিমালা ও নির্ধারিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গত নয় বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনায় ব্যাংকিং বিধি লঙ্ঘন, ভ্যাট-আয়কর ফাঁকি এবং গভর্নিং বডির সদস্যদের নিয়মবহির্ভূত সম্মানী প্রদানের মতো গুরুতর আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ডিআইএ এসব কর্মকাণ্ডকে আর্থিক বিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ২৮৮ জন। এর মধ্যে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১৯৮টি। তবে এসব শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে।
প্রথম ১০০ জন শিক্ষকের নিয়োগে ১৯৮২ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। যদিও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল, তবে নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। এছাড়া পৃথক নিয়োগ কমিটি গঠন এবং গভর্নিং বডির বৈধ অনুমোদনেরও কোনো প্রমাণ অডিট টিমকে দেখাতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে বাকি পাঁচজন শিক্ষকের নিয়োগে অনিয়ম আরও গুরুতর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক ও তিনজন সহকারী অধ্যাপকের নিয়োগে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, সাক্ষাৎকার, নিয়োগ কমিটি কিংবা গভর্নিং বডির অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এসব নিয়োগকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত বলে চিহ্নিত করেছে ডিআইএ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এমপিও নীতিমালা ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কলেজটিতে অতিরিক্ত ৩৪ জন অধ্যাপক এবং ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক পদে শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে। তাদের চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে, যা সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অডিটে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত টানা নয় বছরে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার না করে নগদ অর্থ থেকেই ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ টাকা ব্যয় করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
সরকারি হিসাবরক্ষণ বিধি অনুযায়ী, আদায়কৃত অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদে ব্যয় করাকে ‘সাময়িক আত্মসাৎ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে পরিদর্শনের সময় পর্যন্ত গভর্নিং বডির সদস্যরা ‘সিটিং অ্যালাউন্স’ বা সম্মানী হিসেবে মোট ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা গ্রহণ করেছেন।
ডিআইএ বলেছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্যদের এ ধরনের সম্মানী গ্রহণের কোনো বিধান নেই। ফলে এই অর্থ গ্রহণ সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলেজটির বিভিন্ন কেনাকাটা, নির্মাণকাজ, বিজ্ঞাপন, আপ্যায়ন ও অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট কর্তন করা হয়নি। ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে এভাবে সরকারকে ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকার ভ্যাট থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
এছাড়া পাবলিক পরীক্ষার সম্মানীর ওপর উৎসে আয়কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় আরও ২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭ টাকা রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে কলেজটিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ১০ হাজার ৮১১ জন। ১৮০টি শ্রেণিকক্ষসহ বৃহৎ এ প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনের সময় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নথি ও একাডেমিক হিসাব অডিট টিমকে দেখাতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া কলেজটির বিরুদ্ধে চলমান কয়েকটি মামলার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব মামলা পরিচালনায় কলেজ তহবিল থেকে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার কোনো হিসাব বা প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়নি।
ডিআইএর অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামান পরিদর্শনের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেন।
ডিআইএর পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে ঢাকা সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সব অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রমাণসহ বিস্তারিত জবাব জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করাই ডিআইএর মূল লক্ষ্য। অডিটে উঠে আসা অনিয়মগুলো সরকারি আইন ও নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জবাব ও প্রমাণ যাচাই শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।