দ্বিমুখী চাপে মোদি
- ২১ জুলাই ২০২৬, ১৭:৫২
প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা করে দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য মহাসমাবেশে যোগ দিতে পাঞ্জাব থেকে রওনা হওয়া শত শত কৃষককে হরিয়ানা-পাঞ্জাবের শম্ভু সীমান্তে আটকে দিয়েছে হরিয়ানা পুলিশ। অন্যদিকে নিট রাজধানী দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাজারো সমর্থক যন্তর-মন্তর এলাকায় জড়ো হয়ে সংসদের উদ্দেশে পদযাত্রার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শম্ভু সীমান্তে পুলিশের ব্যারিকেড ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ‘দিল্লি চলো-২’ আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। সে সময় কৃষকদের রাজধানীতে প্রবেশ ঠেকাতে কংক্রিটের ব্লক, লোহার পেরেক এবং একাধিক স্তরের ব্যারিকেড বসিয়ে সীমান্ত কার্যত দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল।
এবারও দিল্লিমুখী যাত্রা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকেরা শম্ভু সীমান্তেই সমাবেশ করেন। তারা অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণভাবে রাজধানীতে গিয়ে প্রতিবাদ জানানোর সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। এ জন্য তারা হরিয়ানা ও পাঞ্জাব উভয় রাজ্য সরকারকেই দায়ী করেন।
বিকেইউ শহীদ ভগৎ সিংয়ের নেতা তেজভীর সিং দাবি করেন, হরিয়ানা পুলিশ পাঞ্জাবের ভূখণ্ডের ভেতরেই ব্যারিকেড স্থাপন করেছে। তার অভিযোগ, পাঞ্জাব সরকার এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
যদিও পাঞ্জাব থেকে আসা কৃষকদের বহর আটকে দেওয়া হয়েছে, তবে আম্বালা, কুরুক্ষেত্রসহ হরিয়ানার বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকেরা দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।
‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে আয়োজিত এই মহাসমাবেশে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন কৃষক সংগঠন অংশ নিচ্ছে। তাদের প্রধান দাবি, প্রস্তাবিত ভারত–মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে হবে।
কিষাণ মজদুর সংগ্রাম কমিটি (কেএমএসসি) নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের জানান, কেএমএসসি, কিষাণ মজদুর মোর্চা (পাঞ্জাব), আজাদ কিষাণ মোর্চা এবং বিকেইউ একতা সংগ্রামের বহর দিল্লির উদ্দেশে রওনা দিলেও শম্ভু সীমান্তে এসে বাধার মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, আলোচনাধীন চুক্তিটি শুধু একটি সাধারণ বাণিজ্য চুক্তি নয়; এটি কৃষি, দুগ্ধ, শিল্প, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, বিনিয়োগ, সরকারি ক্রয়, মেধাস্বত্ব এবং সেবা খাতসহ বিস্তৃত বিষয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
কৃষক নেতাদের দাবি, অতীতের ভারত–মার্কিন বাণিজ্য আলোচনায় সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, ইথানল, আপেল, বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য, পোলট্রি ও মৎস্যপণ্যে শুল্ক কমানো এবং বাজারে প্রবেশ সহজ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে চাপ দিয়ে এসেছে।
তাদের আশঙ্কা, ভর্তুকিপ্রাপ্ত মার্কিন কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ভারতীয় বাজার আরও উন্মুক্ত হলে দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন না। পাশাপাশি চুক্তি নিয়ে সরকারের স্বচ্ছতার অভাব নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
কৃষক সংগঠনগুলোর মতে, ভারতের দুগ্ধ খাত প্রায় ৮ কোটি গ্রামীণ পরিবারের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। ফলে এ খাতে যেকোনো নেতিবাচক প্রভাব পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়বে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দুগ্ধ উৎপাদক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী ও ছোট উদ্যোক্তারা।
এ অবস্থায় ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’ প্রস্তাবিত ভারত–মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব নথি অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
মেডিকেল কলেজে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষা ‘নিট’-এ অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে ককরোচ জনতা পার্টি।
সংসদের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় আন্দোলনকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। সংঘর্ষে কয়েকজন বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মধ্য দিল্লির কয়েকটি এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।
এদিকে সিজেপি তাদের সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে আটকে দেওয়া হলেও কর্মীরা যেন শান্তিপূর্ণ আচরণ করেন। তাদের ভাষ্য, ভালোবাসা ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
এর আগে রোববার দিল্লি পুলিশ ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে এবং বড় ধরনের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পুলিশ জানায়, পূর্বানুমতি ছাড়া পাঁচ বা তার বেশি মানুষের সমাবেশ, মিছিল বা বিক্ষোভ করা যাবে না। কেবল নির্ধারিত স্থান যন্তর-মন্তরে অনুমতি সাপেক্ষে কর্মসূচি পালন করা যাবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে নাগরিকদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়।
নিরাপত্তার স্বার্থে রাজীব চৌক, জনপথ, প্যাটেল চৌক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট ও সেবা তীর্থ এই পাঁচটি মেট্রো স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে রাজীব চৌক মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও প্রস্থান বন্ধ থাকায় শত শত যাত্রীকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, ককরোচ জনতা পার্টি চলতি বছরের মে মাসে অভিজিৎ দীপ একটি ব্যঙ্গধর্মী ডিজিটাল সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের পরজীবী ও তেলাপোকা-সংক্রান্ত একটি মন্তব্যকে ঘিরে বিতর্কের পর দলটির যাত্রা শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং লাখো অনুসারী পায়। বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, সমাজকর্মী, শিল্পী ও ক্রীড়াবিদও দলটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
সূত্র: এনডিটিভি