দ্বিগুণ শেয়ার দর

তলানিতে কুইন সাউথ টেক্সটাইলের ইপিএস

ইপিএস

দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত শতভাগ রপ্তানিমুখী ও বিদেশি বিনিয়োগে পরিচালিত কুইন সাউথ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে শেয়ারদরের অস্বাভাবিক উত্থানের বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও লভ্যাংশ ধারাবাহিকভাবে কমলেও বাজারে এর শেয়ারদর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের সামগ্রিক দরপতনের মধ্যেও কুইন সাউথ টেক্সটাইলের শেয়ারের প্রতি আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত এক বছরে শেয়ারটির দাম প্রায় সাড়ে ৮ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ টাকারও বেশি হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারদর প্রায় ৯৫ শতাংশ বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে কোম্পানিটির মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ৫০-এরও বেশি হয়েছে, যা কোম্পানির বর্তমান আয়ের তুলনায় অনেক বেশি।

অন্যদিকে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৩০ পয়সা, যা ২০২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ২০ পয়সায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেও মুনাফার পতন অব্যাহত রয়েছে। এ সময়ে সমন্বিত ইপিএস হয়েছে মাত্র ২৪ পয়সা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৬ পয়সা। অর্থাৎ কোম্পানির মুনাফা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।

২০২৫ সালের জুনে সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে (অডিট রিপোর্ট) নিরীক্ষকরাও কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পাওনা আদায় না হওয়া এবং সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে পর্যাপ্ত সঞ্চিতি (প্রভিশন) না রাখার বিষয়টি ভবিষ্যতে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মুনাফা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশেও। একসময় নিয়মিত নগদ ও বোনাস লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লভ্যাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। বর্তমানে কোম্পানির অনুমোদিত মূলধন ২০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। শেয়ার মালিকানার কাঠামো অনুযায়ী, ৫১ দশমিক ৫৭ শতাংশ শেয়ার বিদেশি উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে রয়েছে। এছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৫ দশমিক ৬০ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ১ দশমিক ০৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

কোম্পানির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সাভারের ঢাকা ইপিজেডে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি মূলত সুতা ডাইং ও প্রসেসিং কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। হংকংভিত্তিক উদ্যোক্তাদের পরিচালিত কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ওং কুওক চুন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওং জেমি কুওক চান। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি কোম্পানিটির মুনাফার ওপর দীর্ঘদিন ধরেই চাপ সৃষ্টি করছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কোম্পানির মৌলভিত্তি দুর্বল থাকা সত্ত্বেও শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেখানে কারসাজি, অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনা বা গুজবভিত্তিক লেনদেনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই শুধুমাত্র শেয়ারদরের ঊর্ধ্বগতি দেখে নয়, কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা, আয়, লভ্যাংশ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।