আ.লীগের দোসর তারাকারা কে কোথায়?
- ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮:২২
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে দেশের শোবিজ অঙ্গনের বিভিন্ন শিল্পীর ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্দোলনের সময় একদল শিল্পী প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাজপথে অংশ নিলেও, অন্য একটি অংশের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আলোচনায় উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ১ আগস্ট সংস্কৃতি অঙ্গনের কয়েকজন শিল্পী সেখানে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করেন। এ ঘটনায় তাদের ভূমিকা নিয়ে পরবর্তীকালে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যায়।
শুধু তাই নয়, ছাত্রদের আন্দোলন নস্যাৎ করতে আওয়ামীপন্থি শিল্পীরা খুলেছিল ‘আলো আসবেই’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। সেখানে পরিকল্পনা করা হতো কীভাবে ছাত্র-জনতার গায়ে ‘গরম পানি’ ঢেলে দিয়ে আন্দোলন থামানো যায়। এ গ্রুপে দুই শতাধিক সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন। যারা জুলাই বিপ্লবের পুরোটা সময় স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পক্ষ নিয়ে আন্দোলনের বিরোধিতা করে গেছেন এবং কীভাবে আন্দোলনকে দমানো যায় তার পরামর্শ দিয়েছেন।
সাবেক তথ্যপ্রতিমন্ত্রী আরাফাতের সমন্বয়ে এ গ্রুপের অ্যাডমিন ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ-সদস্য ও অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ, রিয়াজ, সাজু খাদেম ও অভিনেত্রী শামীমা তুষ্টি।
গ্রুপের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন-অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস, তানভীন সুইটি, জ্যোতিকা জ্যোতি, রোকেয়া প্রাচী, সোহানা সাবা, সুবর্ণা মুস্তাফা, বিজরী বরকতুল্লাহ, স্বাগতা, শমী কায়সার, আশনা হাবীব ভাবনা, উর্মিলা শ্রাবন্তী কর, হৃদি হক, দীপান্বিতা মার্টিন, নূনা আফরোজ, সঙ্গীতা মেখাল, শাহনূর, অভিনেতা আজিজুল হাকিম, রওনক হাসান, রফিক (রজনীগন্ধা), জামশেদ শামীম, খান জেহাদ, ফজলুর রহমান বাবু, আশরাফ কবীর, সাইমন সাদিক, জায়েদ খান, ঝুনা চৌধুরী, লিয়াকত আলী লাকি, সাইফ খান, স্মরণ সাহা, সায়েম সামাদ, শাকিল (দেশনাটক), শহীদ আলমগীর, মো. শাহাদাত হোসেন, মিলন ভট্ট, নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদ, মাসুদ পথিক, এবার্ট খান, জুয়েল মাহমুদ, মুশফিকুর রহমান গুলজার, এসএ হক অলীক, রুবেল শঙ্কর, রাজিবুল ইসলাম রাজিব, সৈয়দ আওলাদ প্রমুখ। এদের মধ্যে অনেকেই এখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়ভাবে ও প্রকাশ্যে জুলাই আন্দোলন ও সরকারের বিরোধিতা করছেন। কারা কোথায় থেকে এসব করছেন তা নিম্নে তুলে ধরা হলো-
কে কোথায়?
ফেরদৌস : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেমালুম গায়েব হয়ে যান এ অভিনেতা। বর্তমান তার অবস্থান আমেরিকায় বলে জানা গেছে।
রিয়াজ : শেখ হাসিনার পলায়নের পর ঢাকাই সিনেমার এ অভিনেতাও আত্মগোপনে চলে যান। অদ্যাবধি তিনি আর প্রকাশ্যে আসেননি। তবে তিনি দেশেই আছেন বলে জানা গেছে।
সাজু খাদেম : এ অভিনেতাও কিছুদিন আড়ালে এখন আবারও জুলাইবিরোধী প্রচারণায় সরব হয়েছেন।
শামীমা তুষ্টি : এ অভিনেত্রী বেশ কিছুদিন আড়ালে থাকলেও বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় জুলাই ও সরকারবিরোধী প্রচারণা চালান। তিনিও দেশেই আছেন।
অরুণা বিশ্বাস : এ অভিনেত্রী আন্দোলন-পরবর্তী কানাডায় পালিয়ে যান। সেখানে কিছুদিন নীরব থেকে আবারও জুলাইবিরোধী প্রচারণায় সরব হন।
তানভীন সুইটি : তিনি দেশে আছেন। তবে খুব একটা অ্যাক্টিভ নন।
জ্যোতিকা জ্যোতি : এ অভিনেত্রী আন্দোলন-পরবর্তী অনেক দিন আড়ালে থাকলেও ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ায় জুলাই ও সরকারের সমালোচনায় বেশ সরব।
রোকেয়া প্রাচী : জুলাই-পরবর্তী কিছুদিন পালিয়ে বেড়ালেও এ অভিনেত্রী গত বছর থেকে দেশে বসেই প্রকাশ্যে জুলাই বিরোধিতা করে যাচ্ছেন।
সোহানা সাবা : আন্দোলন-পরবর্তী তিনি আড়ালে চলে যান। আন্দোলন-পরবর্তী গোয়েন্দা পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেলেও পরবতী সময়ে ছেড়ে দেয়। এরপর বেশ কিছুদিন কলকাতায় ছিলেন। বর্তমানে তিনিও দেশে আছেন বলে জানা গেছে।
বিজরী বরকতুল্লাহ : জুলাই-পরবর্তী তিনি কিছুদিন আড়ালে থাকলেও বর্তমানে তিনি প্রকাশ্য এবং দেশেই আছেন। তবে অনেকটাই নীরব।
স্বাগতা : তিনিও দেশে আছেন, এবং অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে।
আশনা হাবিব ভাবনা : জুলাই আন্দোলন নিয়ে এ অভিনেত্রীর অবস্থান ছিল ধোঁয়াশায়, সুবিধামতো কখনো পক্ষে, আবার কখনো বিপক্ষে। বর্তমানে তিনি দেশে প্রকাশ্যে আছেন এবং নিয়মিত কাজও করছেন।
উর্মিলা শ্রাবন্তী কর : শেখ হাসিনার পলায়নের পর তিনিও আড়ালে চলে যান। তবে দেশে আছেন বলেই জানা গেছে।
হৃদি হক : এ অভিনেত্রী-নির্মাতাও দেশে অবস্থান করছেন।
নূনা আফরোজ : আন্দোলন-পরবর্তী কিছুদিন আড়ালে থাকলেও গত বছর থেকেই তিনি দেশে বসে প্রায়শই জুলাইবিরোধী মন্তব্য করেন।
আজিজুল হাকিম : প্রকাশ্যে জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করা এ অভিনেতা এখন দেশে বসে বেশ আরামেই কাজ করছেন মিডিয়ায়।
আহসান হাবিব নাসিম ও রওনক হাসান : অভিনয়শিল্পী সংঘের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এ দুই অভিনেতা প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে স্বৈরাচার হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। হাসিনার পলায়নের পর কিছুদিন দেশের ভেতরেই আড়ালে ছিলেন। বর্তমানে দুজনেই প্রকাশ্য এবং কাজ করছেন।
ফজলুর রহমান বাবু : তিনিও দেশে আছেন, এবং গত দুবছর নিয়মিতই কাজ করেছেন।
সাইমন সাদিক : ঢাকাই সিনেমার এ নায়ক আন্দোলনের পরপরই পালিয়ে আমেরিকা চলে যান। সেখানে বসেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত জুলাই ও সরকারবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মাহিয়া মাহী : এ চিত্রনায়িকা কিছুদিন আড়ালে থেকে পরবর্তী সময়ে আমেরিকায় চলে যান। বর্তমানে সেখানে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় জুলাই ও সরকারবিরোধী প্রচারণায় লিপ্ত আছেন।
মেহের আফরোজ শাওন : এ অভিনেত্রীও কিছুদিন আড়ালে থেকে গত বছর থেকে দেশে বসেই প্রকাশ্যে জুলাইবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। অন্তবর্তী সরকারের আমলে গ্রেফতার হলেও ছাড়া পেয়ে যান।
নিপুণ : আওয়ামী সুবিধাভোগী এ চিত্রনায়িকা জুলাই-পরবর্তী বিদেশে পালিয়ে যেতে চাইলেও বিমানবন্দর থেকে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে আড়ালে থেকেই জুলাই ও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
শুভ্রদেব : এ সংগীতশিল্পী কিছুদিন আড়ালে ছিলেন। বর্তমানে তিনি আবারও সরব হয়েছেন।
মমতাজ : আওয়ামী লীগের সংসদ-সদস্য এ সংগীতশিল্পী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
লিয়াকত আলী লাকি : আন্দোলনের পর তাকে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক থেকে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি দেশে আছেন বলে জানা গেছে।
সাইফ খান : ঢাকাই সিনেমার এ অভিনেতা দেশে বসেই জুলাইবিরোধী প্রচারণা চালান নিয়মিত।
মিলন ভট্ট : আন্দোলন-পরবর্তী এ অভিনেতা বেশ কিছুদিন আড়ালে ছিলেন। বর্তমানে তিনি মিডিয়ায় নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করছেন।
বদরুল আনাম সৌদ : এই নির্মাতা এখনো দেশে আছেন বলে জানা গেছে।
মাসুদ পথিক : এ নির্মাতাও দেশে আছেন।
মুশফিকুর রহমান গুলজার : এ নির্মাতা জুলাই আন্দোলনের প্রকাশ্য বিরোধিতাকারী। বর্তমানে তিনি দেশে বসেই, খোদ এফডিসিতেই প্রকাশ্যে তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
এসএ হক অলীক : এ নির্মাতা আন্দোলন-পরবর্তী আমেরিকায় চলে যান। এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন তিনি।
খোরশেদ আলম খসরু : জুলাই আন্দোলনের প্রকাশ্য বিরোধিতাকারী এ প্রযোজক কিছুদিন আড়ালে থাকার পর আবারও সরব হয়েছেন। বর্তমানে তিনি চলচ্চিত্রের প্রযোজক সমিতির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
এ ছাড়া আন্দোলনে বেশ কিছু তারকাশিল্পী ছিলেন নীরব ভূমিকায়। হাসিনার দোসর হিসাবে চিহ্নিত সেসব শিল্পীরা নীরবে হাসিনার পক্ষে কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম যারা ছিলেন তারা হলেন-
চঞ্চল চৌধুরী : এ অভিনেতা বহুবার গণভবনে গিয়ে হাসিনাকে ‘মা’ সম্বোধন করে গান শোনানোর আবদার করতেন। গানও শুনাতেন। আন্দোলন-পরবর্তী কিছুদিন আড়ালে থাকলেও তিনি বর্তমানে বেশ আরামেই মিডিয়ায় কাজ করছেন।
মীর সাব্বির ও তারিন জাহান : এ দুই অভিনয়শিল্পী সর্বদা শেখ হাসিনার তোষামোদে ব্যস্ত ছিলেন। যে কোনো আয়োজনে হাসিনা উপস্থিত থাকুক বা না থাকুক, মাইক্রোফোন হাতে তার বন্দনায় মত্ত থাকতেন তারা। আন্দোলন-পরবর্তী তারা আড়ালে চলে গেলেও মীর সাব্বির আবারও সরব হয়েছেন মিডিয়ায়। তবে তারিন এখনো আড়ালে থেকেই জুলাইবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নুসরাত ফারিয়া : এ চিত্রনায়িকা তো স্বয়ং হাসিনার রূপেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’ নামে একটি সিনেমায় তিনি হাসিনার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এরপর থেকেই তার ভেতরেও স্বৈরাচার হাসিনা ভর করেছে। আন্দোলনে তিনি ছিলেন বিদেশে। দেশের রাজপথ যখন ছাত্র-জনতার রক্তে সিক্ত, তখন বিদেশ থেকেই স্বল্পবসনা ছবি প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যমে উত্তাপ ছড়িয়ে আন্দোলনকে ভিন্নখাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল তার। তাকে একবার গ্রেফতার করাও হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে এ অভিনেত্রী দেশেই আছেন।
আরেফিন শুভ : মুজিব সিনেমায় মুজিবের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এ অভিনেতা। বিনিময়ে হাসিনার থেকে পেয়েছিলেন পূর্বাচলে প্লট। যদিও আন্দোলন-পরবর্তী সমালোচনার মুখে সেই প্লট বরাদ্ধ বাতিল হয়ে যায়। এ শুভও জুলাই আন্দোলনের পক্ষে কোনো কথা না বলা এক অভিনেতা। আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে নিজের বিয়ে বিচ্ছেদের খবরও প্রকাশ্যে এনেছিলেন সেসময়। যদিও তার এ বিচ্ছেদ আরও অনেক আগেই হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পিতভাবেই তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্দোলন থেকে মানুষের দৃষ্টি ভিন্নদিকে সরাতে নিজের বিয়ে বিচ্ছেদের পুরোনো খবর প্রকাশ্যে আনেন আওয়ামী সুবিধাভোগী এ শিল্পী। বর্তমানে তিনিও বেশ আরামেই কাজ করছেন মিডিয়ায়।
এ ছাড়া এমন আরও অনেক তারকা রয়েছেন যারা সামাজিক মাধ্যমে বেশ সরব ছিলেন আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে। এসব দলকানা শিল্পীরা কাজ করে গিয়েছেন স্বৈরাচার হাসিনার হয়ে। আন্দোলন নিয়ে এসব শিল্পী রাজপথ থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যম সব জায়গায় ছিলেন নীরব। শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত নিথর দেহও তার মন গলাতে পারেনি।