আটলান্টিকে অনুষ্ঠিত হল বিএমএএনএর বার্ষিক সম্মেলন

যুক্তরাষ্ট্র

চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, পেশাগত উৎকর্ষ, মানবিক সেবা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বার্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে সেন্ট্রাল বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা (সেন্ট্রাল বিএমএএনএ) বার্ষিক সম্মেলন। সম্প্রতি আটলান্টিক সিটির ট্রপিকানা রিসোর্টে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী এ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাঁচ শতাধিক চিকিৎসক, তাঁদের পরিবার, শিক্ষাবিদ, কমিউনিটি নেতা ও অতিথিরা অংশ নেন। সম্মেলনের মূল আলোচনায় উঠে আসে—উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি চিকিৎসকদের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কীভাবে বাংলাদেশসহ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও মানবিক কল্যাণে কাজে লাগানো যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার চিকিৎসক সমাজের মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও পেশাগত সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

এতে সভাপতিত্ব করেন সেন্ট্রাল বিএমএএনএ’র সভাপতি ডা. ফজলুল ইউসুফ। সম্মেলনের প্রধান আহবায়ক ও নিউইর্য়ক বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক ডা.মুজিবুর রহমান মজুমদার এবং ডা. জামালউদ্দিন-এর নেতৃত্বে বিভিন্ন কমিটির সমন্বিত প্রচেষ্টায় অত্যন্ত ঝাকঝমকপূর্ন ভাবে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সেক্রেটারি ডা. খন্দকার মাসুদুর রহমানের পরিচালনায় সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন নিউ জার্সির লেফটেন্যান্ট গভর্নর ড. ডেল জি. ক্যাল্ডওয়েল।

চারদিনব্যাপী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আটলান্টিক সিটির মেয়র মার্টি স্মল সিনিয়র, চিকিৎসা শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. কর্নাড ফিশার, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন এবং নাগরিক সংগঠন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। সম্মেলনে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ও বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জোবায়দা রহমান ও বিশিষ্ট হৃদরোগ সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর কবির ভার্চুয়ালীভাবে যুক্ত হয়ে শুভেচ্ছা জানান।

 

সম্মেলনে চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, মানবিক নেতৃত্ব, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। এরমধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিএমএএনএ’ লাইফটাইম গ্লোবাল হিউম্যানিটেরিয়ান লিডারশীপ এওয়ার্ড, চিকিৎসাক্ষেত্রে ডা. জাহাঙ্গীর কবির, চিকিৎসা শিক্ষা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অবদানের জন্য প্রফেসর ডা. কর্নাড ফিশার; চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যে আজীবন অবদানের জন্য প্রফেসর ডা. এম. এ. ফয়েজ এবং চিকিৎসা ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ডা. হিউবার্ট ডি’ক্রুজ বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন।

সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে আগত বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও অতিথি অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের পরিচালক ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেন্নুর, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুস শাকুর খান, বাংলাদেশ লাঙ্গ ফাইন্ডেশনের সভাপতি প্রফেসর আলী হোসেন, প্রফেসর রহমানউল্লাহ বারী, গ্রামীণ হেলথটেক লিমিটেডের ড. আরমান সিদ্দিকী এবং গ্রামীণ কল্যাণের মঈনুদ্দিন চৌধুরী। বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে আগত চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও কমিউনিটি নেতাদের অংশগ্রহণ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।

সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম। এ উপলক্ষে প্রকাশিত মেডিকেল জার্নাল ও কনভেনশন স্যুভেনিরে চিকিৎসাবিষয়ক প্রবন্ধের পাশাপাশি সেন্ট্রাল বিএমএএনএ’র কার্যক্রম, সংগঠনের ইতিহাস, সদস্যদের সাফল্য এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অবদান তুলে ধরা হয়। জার্নাল ও স্যুভেনির সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন ডা. জাহিদ দেওয়ান শামীম ও ডা. আশরাফুল হক। বৈজ্ঞানিক পর্বে চিকিৎসকদের জন্য আয়োজিত সিএই কার্যক্রমে ১০ ঘণ্টার সিএমই ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ ছিল। পালমোনারি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার, স্লিপ মেডিসিন, সংক্রামক রোগ, জরুরি চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, কার্ডিওলজি এবং সমসাময়িক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রবন্ধ ও উপস্থাপনা করেন। তাঁদের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে বৈজ্ঞানিক অধিবেশনগুলোতে চিকিৎসকদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়।

নন-সিএমই অধিবেশনে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা, পেশাগত নেতৃত্ব, প্রযুক্তির ব্যবহার, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সুস্থ জীবনযাপন এবং বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার চিকিৎসকদের সম্ভাব্য যৌথ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। সম্মেলনে তরুণ চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ক্যারিয়ার ও নেতৃত্ববিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা করেন ডা. মোহাম্মদ হোসাইন মিন্টু। রেসিডেন্সি, ফেলোশিপ, উচ্চতর প্রশিক্ষণ, গবেষণা, পেশাগত নেটওয়ার্কিং এবং নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ নিয়ে কর্মশালায় আলোচনা হয়। আয়োজকদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাংলাদেশি চিকিৎসকদের পেশাগত অগ্রযাত্রায় এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরিবারকেন্দ্রিক কর্মসূচি। চিকিৎসকদের জীবনসঙ্গী, নারী সদস্য এবং শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ডা. জারিন আল-তারিক ও ডা. রুমানা সাবুর-এর নেতৃত্বে উইম্যান এলায়েন্স ও ইয়াং চিলড্রেন প্রোগ্রামে নারীস্বাস্থ্য, পরিবার, নেতৃত্ব, সামাজিক অংশগ্রহণ, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত বিকাশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। শিশু-কিশোরদের জন্য ছিল শিক্ষামূলক কার্যক্রম, প্রতিযোগিতা, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। 

সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দায়িত্বে ছিলেন ডা. কাজী রহমান সজল ও ডা. বর্নালী হাসান। গালা নাইটে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কোনা ও ইমরান সংগীত পরিবেশন করেন। পাশাপাশি ছিল ওশান ক্রুজ, পারিবারিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নেটওয়ার্কিং ও পারিবারিক পিকনিক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা ও স্কুল শুটিংয়ের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা অস্কারজয়ী স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘অল দ্য এম্পটি ‍রুমস’ প্রদর্শিত হয়। চলচ্চিত্রটি প্রাণহানির বেদনা ও নিরাপদ সমাজ গড়ার জরুরি বার্তা গভীরভাবে তুলে ধরে। বৃহৎ এ সম্মেলন সফল করতে বিভিন্ন কমিটি ও বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছিল দৃষ্টিনন্দিত। স্থান ব্যবস্থাপনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অতিথি আপ্যায়ন, নিবন্ধন, যোগাযোগ, সময়সূচি ও বিভাগীয় সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ডা. মোস্তফা হাসান শামীম, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান টিংকু, ডা. শাহ আলম রনি, ডা. আতাউল চৌধুরী তুষার ও ডা. নাফিজুর রহমান। আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন ডা. শাহ আলম রনি, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান টিংকু ও ডা. আতাউল চৌধুরী তুষার। সম্মেলনের বিভিন্ন পর্যায়ে উপদেষ্টা হিসেবে দিকনির্দেশনা দেন ডা. কাজী আল-তারিক, ডা. এ. বি. সিদ্দিকী ও ডা. আতাউল ওসমানী।

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডা. কাজী আল-তারিক সেন্ট্রাল বিএমএএনএ’র নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেন। এতে ডা. মুজিবুর রহমান মজুমদার সভাপতি, ডা. আতাউল ওসমানী সহসভাপতি, ডা.খন্দকার মাসুদুর রহমান সাধারণ সম্পাদক, ডা. জাহিদ দেওয়ান শামীম কোষাধ্যক্ষ, ডা. রুমানা সাবুর সাংগঠনিক সম্পাদক, ডা. রিয়াজ ফেরদৌস শিবলী বৈজ্ঞানিক সম্পাদক, ডা. কাজী রহমান সজল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পাদক, ডা. মোহাম্মদ হোসাইন মিন্টু তরুণ চিকিৎসকবিষয়ক সম্পাদক, ডা. বেলায়েত হোসাইন, ডা. আমিরুল ইসলাম ও ডা. কানিজ বানু হিমি মেম্বার-অ্যাট-লার্জ নির্বাচিত হন।

নবনির্বাচিত কমিটি সংগঠনের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন উদ্যোগ গ্রহণ, তরুণ চিকিৎসকদের পেশাগত বিকাশে সহযোগিতা, জনস্বাস্থ্য ও মানবিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার চিকিৎসকদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রত্যয় ব্যক্ত করে।

আটলান্টিক সিটির এ সম্মেলন শুধু প্রবাসী চিকিৎসকদের পুনর্মিলন নয়; বরং পেশাগত উৎকর্ষ, জ্ঞান বিনিময়, মানবিক দায়বদ্ধতা ও নেতৃত্ব বিকাশের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সামনে এসেছে। প্রবাসে বাংলাদেশি চিকিৎসকদের অর্জনকে বৃহত্তর মানবকল্যাণে কাজে লাগানো এবং বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার চিকিৎসক সমাজের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়েই শেষ হয় সেন্ট্রাল বিএমএএনএ বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬।