বন্ধ শত শত শিল্পকারখানা

কারখানা

দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ায় শিল্প খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বুধবার থেকে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত শত কারখানার উৎপাদন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়ার পাশাপাশি চরম বিপাকে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

শিল্প খাতের জন্য বরাদ্দ থাকা গ্যাসের বড় অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করায় এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন সংকট চললে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিলের আশঙ্কাও করছেন উদ্যোক্তারা।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তবে সংকট সমাধানে সরকার কাজ করছে। জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ও টেকসই সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে তিতাসের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। গ্যাসের চাপ একেবারে না থাকায় শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা চলছে।

হবিগঞ্জে বন্ধ ১৭১ কারখানা

গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি হবিগঞ্জ। জেলার ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পকারখানায় বুধবার থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সংকট দীর্ঘায়িত হলে এসব শ্রমিকের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।

গাজীপুরেও ব্যাহত উৎপাদন

শিল্পাঞ্চলখ্যাত গাজীপুরে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল কয়েকশ কারখানা সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের চাপ ওঠানামা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক ছাঁটাই

সাভার-আশুলিয়ার প্রায় দেড় হাজার শিল্পকারখানার মধ্যে গ্যাসনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। পোশাক কারখানার বয়লার, ডায়িং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ও আয়রনিং বিভাগ স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না।

শিল্পোদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনের জন্য যেখানে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৮ পিএসআই। কোথাও চাপ আরও কম। ফলে কোনো কারখানায় আংশিক উৎপাদন চললেও অনেক প্রতিষ্ঠানকে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, চলতি মাসে সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। এতে শিল্পাঞ্চলটির শ্রমবাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে ৪৫০ ডায়িং কারখানা বন্ধ

নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানা থেকে ফ্যাব্রিক্স না পাওয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানাও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি হওয়ায় ডায়িং কারখানা থেকে প্রয়োজনীয় ফ্যাব্রিক্স পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে অনেক গার্মেন্টসের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী কয়েক দিনেও সংকট কাটার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে গ্যাস সংকটে নরসিংদীর একটি স্পিনিং মিলে জেনারেটর বন্ধ থাকায় প্রায় এক হাজার ২০০ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের সিএনজি স্টেশনগুলোও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছে। একই সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যেও গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে শুধু শিল্পকারখানার উৎপাদন নয়, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল, শ্রমিক ছাঁটাই এবং রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।