‘তাকওয়া মার্ট’-এর ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদ

প্রতারণা
তাকওয়া মার্টের ফেসবুক পেজ

বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে জীবনে প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসেছিলেন নোরা। ঢাকার পরিবেশের সঙ্গে এখনও ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারেননি সে। এর মধ্যেই পড়েন বড় ধরনের এক প্রতারণার ফাঁদে। বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য আর মন ভোলানো কথায় গলে গিয়ে অনেকটাই সর্বস্ব খুইয়েছেন সদ্য বিবাহিতা এই তরুণী।

সম্প্রতি স্বামীর জন্য ‘তাকওয়া মার্ট’ নামের অনলাইনভিত্তিক শপ থেকে ১২৪৯ টাকা দামের একটি ঘড়ি অর্ডার করেছিলেন তিনি। প্রোডাক্ট দেখে অর্ডার কনফার্ম করেন নোরা। তবে এর পরই ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদে পড়তে শুরু করেন তিনি।

প্রোডাক্ট দেখে অর্ডার কনফার্ম করার পর পণ্য ডেলিভারির জন্য ঠিকানা ও ফোন নাম্বার চাওয়া হয়। ঠিকানা দিলে বলা হয় রেডি এক্স ডেলিভারি ম্যান দ্বারা এস এ পরিবহনে কন্ডিশন করে অনলাইন কোড পেমেন্টের মাধ্যমে প্রোডাক্ট পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর তাকওয়া মার্ট থেকে একটা নাম্বার দিয়ে টাকা বিকাশ করতে বলেন শপের কর্মরত এক ব্যক্তি।

নোরা তখন জিজ্ঞাসা করে কীসের টাকা? আমি তো ক্যাশ অন ডেলিভারি নেবো। তখন শপ থেকে বলা হয়, আগে টাকা দিতে হবে। নোরা বলেন, আমি যখন অর্ডার কনফার্ম করেছিলাম তখন তো বলেনি যে আমাকে অগ্রিম টাকা দিতে হবে। এরপরই শুরু হয় হুমকি আর ভয় দেখানোর সিলসিলা। অর্ডার কনফার্ম হয়েছে, এখন টাকা না দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুমকি দেন সেই ব্যক্তি। তিনি বলেন, অবশ্যই বলে দেওয়া হয়েছে, এটা অনলাইন কোড পেমেন্টের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। এখানে কোনো ক্যাশ অন ডেলিভারির কথা বলা হয়নি, আপনিও বলেন নাই। এরপর তিনি বলেন, আপনি যদি প্রতারণার চেষ্টা করেন তবে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো। আমাদের শো-রুমের মালিক আর্মির কর্নেল, সে যে ব্যবস্থা নেয় নেবে। আপনি নাম্বার ব্লক করে দিলেও লাভ নেই। আপনার ঠিকানা আমাদের কাছে আছে, আর যে নাম্বার দিয়েছেন সেটা আপনার মা-বাবার অথবা আপনার এনআইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা। এতটুকু মাথায় রাখবেন।

তবে সহজ-সরল নোরা জানে না অর্ডার ক্যান্সেল করলে কী আইনি জটিলতায় পড়তে হয়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে অর্ডার ক্যান্সেল করলে প্রতারণা মামলা বা ফৌজদারি ঝামেলা হয় না।

তবে নোরাকে বারবার আইনের ভয় দেখিয়ে হুমকি দেওয়া হলে একপর্যায়ে ভয়ে তিনি মেসেজেই হাত-পা ধরা শুরু করেন। বলেন, ভাইয়া আপনার পায়ে ধরি এগুলো করবেন না। আমি একজন মেয়ে, ঢাকায় নতুন এসেছি। আমি জানি না যে এটাতে অগ্রিম টাকা দিতে হবে। আমি ভেবেছি ক্যাশ অন ডেলিভারি হবে, এ করাণে অর্ডার করেছিলাম। আর এখানে কিছু চিনিও না। প্লিজ ভাইয়া এগুলো করবেন না।

তবে এমন রিকোয়েস্টেও মন গলেনি তার। উল্টো হুমকি দিয়ে বলেন, আমাদের করার কিছু নেই, অর্ডার কনফার্ম করে ফেলেছি। টাকা না দিলে আমাদের ঝামেলা হবে। আর আমাদের ঝামেলা হলে আপনারও ঝামেলা হবে।

ভয়ে ভয়ে নোরা বলেন, প্লিজ ভাইয়া বোঝার চেষ্টা করেন, আমি একজন মেয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাই না। আমি এখানে কিছু চিনি না। আর আমার ফোনে বিকাশও নেই যে আপনার কাছে টাকা পাঠিয়ে দেবো। আপনার পায়ে ধরি এমন করবেন না। আমি আমার আব্বু আম্মুর কসম করবে বলতেছি আমি এখানে কিছু চিনি না, নতুন আসছি ঢাকায়।

দুইদিন ধরে এমন মানসিক যান্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যান নোরা। পরে ওই ব্যক্তি বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, এর মধ্যে টাকা না দিলে আপনার নাম্বার আর মেসেজে যে কথা হয়েছে সেটা স্যারের কাছি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আপনার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবো। ফাইজলামি কতো প্রকার ও কি কি দেখাচ্ছি আপনাকে।

নতুন ঢাকায় আসা নোরা ভয়ে ভয়ে সংসার খরচের টাকা থেকে তাদের দেওয়া বিকাশ নাম্বারে খরচসহ ১২৭২ টাকা পাঠিয়ে দেন। মনে মনে ভাবেন, স্বামীর বকুনি শুনলেও আইনি জটিলতা আর মানসিক যন্ত্রণা থেকে তো বাঁচি! কিন্তু তার যন্ত্রণার যে এখানেই শেষ হচ্ছে না এটা সে বুঝতে পারেনি। ১২৪৯ টাকার বেশি পাঠানোয় নাম্বার ব্লক হয়ে গেছে বলে তার কাছে আবার টাকা চাওয়া হয়। আবারও তারা হুমকি-ধামকি দেওয়া শুরু করেন।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নোরা বলেন, আমি এর আগেও অনলাইনে পণ্য কিনেছি। সাধারণত অনলাইনে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ হয় বলেই জানি। কিন্তু তারা আমাকে বলে ক্যাশ অন নয়, অগ্রিম টাকা দিতে হবে। এজন্য নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা নিয়েছে। তবে টাকা দেওয়ার পরেও বেশি পেমেন্ট হয়েছে বলে আবার টাকা চায়। গতকাল সোমবার (১৭ আগস্ট) পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার কথা থাকলেও তারা দেয়নি। উল্টো আরও ১২৪৯ টাকা চাওয়া হয়, না দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। দুইদিন ধরে আমি ভয়ংকর মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে বাংলাকণ্ঠ থেকে যোগাযোগ করা হলে ওই ব্যক্তি তার অফিসের উর্ধ্বোতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিচ্ছি বলে লাইন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর রিসিভ করেনি।