কলকাতায় গিয়ে বিপদে বাংলাদেশিরা
- ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৭:২২
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সেখানে অবস্থানরত হাজারো বাংলাদেশি পর্যটক। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর পর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে অভিযান শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ, পৌরসভা, দমকল ও বিদ্যুৎ বিভাগ।
মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় নিউমার্কেট এলাকার মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিটে ২২১টি হোটেল ও ৯টি রেস্তোরাঁ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাবিধি না মানায় কয়েকটি হোটেলের বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা আগেই জানিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মির্জা গালিব স্ট্রিটে অগ্নিকাণ্ডের পর ওই দিন সন্ধ্যা থেকেই নিউমার্কেট থানার পুলিশ হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে অভিযান শুরু করে। অভিযানে উপমুখ্যমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও অংশ নেন এবং কয়েকটি হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর মধ্যে কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পৌরসভা, দমকল ও সিইএসসির সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কলকাতার সাড়ে ৩ হাজারের বেশি হোটেলের নিরাপত্তাবিধি পর্যালোচনা করবে কমিটিটি। তবে বৃহত্তর কলকাতার তুলনায় নিউমার্কেট এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে বেশি কঠোরভাবে।
বিপাকে হাজারো বাংলাদেশি
হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিউমার্কেট এলাকায় অবস্থানরত বাংলাদেশি পর্যটকদের বড় একটি অংশ অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। বর্তমানে কলকাতায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার পর্যটক নিউমার্কেট এলাকায় রয়েছেন।
হোটেল ছাড়ার নির্দেশ পাওয়ার পর কেউ নতুন করে থাকার জায়গা খুঁজছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নতুন হোটেল পেতে দালালের শরণাপন্ন হলেও অনেক পর্যটককে আগের তুলনায় বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাড়া দেড় থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কলকাতার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। নিউমার্কেট এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের কেন্দ্র করে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবার ব্যবসা গড়ে উঠেছে। ফলে হোটেল বন্ধের প্রভাব পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতেই পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
কলকাতার গ্রিন লাইন পরিবহনের শ্যামল ঘোষ বলেন, সীমান্ত থেকে বাসগুলোতে যাত্রী পূর্ণ হয়ে কলকাতায় আসছেন। কিন্তু বর্তমানে পর্যটকদের থাকার মতো পর্যাপ্ত হোটেল পাওয়া যাচ্ছে না। আশপাশের এলাকায় কিছু হোটেল পাওয়া গেলেও সেখানে ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সরকারের নিরাপত্তা উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, হোটেল মালিকদের কিছুটা সময় দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হতো।
হোটেল ছাড়তে হচ্ছে পর্যটকদের
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল থেকেই নিউমার্কেট এলাকায় বিভিন্ন হোটেল থেকে পর্যটকদের বের হয়ে যেতে দেখা যায়। হঠাৎ হোটেল ছাড়ার নির্দেশ পাওয়ায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হোটেল মালিক জানান, তার হোটেলে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন। সোমবার তাদের হোটেল ছেড়ে দিতে বলা হয়।
এক হোটেলকর্মী সেলিম বলেন, মির্জা গালিব স্ট্রিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, অথচ এর পর থেকে আশপাশের হোটেলগুলোতেও বন্ধের নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। এতে তাদের জীবিকা বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
ঢাকার বাসিন্দা নাসিব পাপ্পু চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েন। তিনি জানান, রোববার বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় গিয়ে একটি হোটেলে ওঠেন। হোটেলে ওঠার সময় তাকে কোনো কিছু জানানো হয়নি। পরে বাইরে থেকে ফিরে জানতে পারেন, পুলিশ হোটেল কর্তৃপক্ষকে সেটি খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে তাকে হোটেল ছাড়তে হয়।
নাসিব বলেন, চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে থাকার জায়গা নিয়ে এমন সমস্যায় পড়তে হবে, তা ভাবেননি। এ ধরনের পরিস্থিতির কারণে ভবিষ্যতে কলকাতায় আসার বিষয়ে তাকে নতুন করে ভাবতে হবে বলেও জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৯
গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গভীর রাতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ১৫জি, মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি এবং দুজন ভারতীয় নাগরিক।
নিহত বাংলাদেশিরা হলেন আকরাম আলী (৭৪), দেবাশীষ দত্ত (৩৯), আফসানা শিরমিন (২৭), সর্নাশীষ দত্ত (২), বাবু আহমেদ (৩৭), রেবতী সরকার ও এস এম আলিমুজ্জামান।
নিহত দুই ভারতীয় নাগরিক হলেন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা সন্দীপ পাশওয়ান (১৯) এবং শিলিগুড়ির বাসিন্দা যোগ নারায়ণ আগারওয়াল (৬৮)।
অগ্নিকাণ্ডের পর পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিউমার্কেট এলাকায় হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা কোনো হোটেলকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর্যটননির্ভর নিউমার্কেট এলাকার অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।