সরকারের ৬ মাস কেমন গেলো?
- ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৩৪
নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের পথে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হলেও রাজস্ব আদায়, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রমের পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমে মিশ্র চিত্র পাওয়া গেলেও নেতিবাচক প্রবণতার আধিক্য রয়েছে। এর বড় একটি অংশই কাঠামোগত সমস্যা।
সিপিডির পর্যালোচনায় শাসন ও প্রশাসন, সরকারি অর্থব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষাসহ নয়টি খাতের ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবে নেওয়া পদক্ষেপের ভিত্তিতেই এ মূল্যায়ন করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও জীবনযাত্রার চাপ বহাল
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশে।
তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো বেশি। পাশাপাশি প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে মনে করছে সিপিডি।
রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগে শঙ্কা
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। তাদের হিসাবে, মার্চ থেকে মে সময়ে মোট কর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। এতে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে।
সিপিডি পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে। এর ফলে উন্নয়ন ব্যয়, বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) কাটছাঁটের চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
বেসরকারি বিনিয়োগের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়েছে। কমেছে নিট বিদেশি বিনিয়োগও।
সিপিডির মতে, এসব সূচকে দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়ানোর সুস্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
গ্যাস সংকটে শিল্পে ধাক্কা
চলমান গ্যাস সংকটকে শিল্প ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে সিপিডি। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, বিকল্প এলএনজি কার্গো সংগ্রহে জটিলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে। মার্চ-এপ্রিল সময়ে শিল্প উৎপাদনের সাধারণ সূচক ও উৎপাদনশিল্পের সূচক—দুটির প্রবৃদ্ধিই শূন্যে নেমে এসেছে। একই সময়ে শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহারও কমেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময়বদ্ধ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত জ্বালানি মজুত, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি।
ব্যাংক খাতে সংস্কার হলেও আস্থার সংকট
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সরকারের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সিপিডি। এর মধ্যে পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা এবং সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক রেজুলেশন আইন প্রয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করেছে তারা।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা, শীর্ষ পর্যায়ে নিয়োগ এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সিপিডির মতে, ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রয়োজন।
রিজার্ভ বাড়লেও বহিঃখাতে চাপ
বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো স্বস্তিদায়ক নয় বলে মনে করছে সিপিডি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ আগস্টের মধ্যে বিপিএম-৬ হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে।
তবে একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। প্রবাসী আয় ও বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধিও কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে এর অন্যতম প্রভাবক হিসেবে দেখছে সিপিডি।
পুনরুদ্ধার ধীর হওয়ার কারণ
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীর হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির অভাব, দুর্বল রাজস্ব ও আর্থিক কাঠামো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যে চাপ, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির ঘাটতি।
সংস্থাটির মতে, শুধু মূল্যস্ফীতি কমার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বিচার করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ও সুদের হারে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান উন্নতি প্রয়োজন।
সমন্বিত সংস্কারের পরামর্শ
দীর্ঘায়িত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে গতিশীল করতে আগামী অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত ‘কোর বাজেট’ তৈরির পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। তাদের মতে, বাস্তব সময়ের তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক কাঠামোর ভিত্তিতে এ বাজেট প্রণয়ন করা উচিত।
একই সঙ্গে জ্বালানি, ব্যাংক খাত, রাজস্ব প্রশাসন, উন্নয়ন ব্যয়, নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা ও ডিজিটালাইজেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং সংসদের কাছে নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সিপিডির সামগ্রিক মূল্যায়নে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু সংস্কারমূলক ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অর্থনীতির প্রধান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। ফলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে সমন্বিত, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সংস্কার কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।