শত নারীর ‘ইজ্জতের’ বিনিময়ে শতকোটির মালিক অপরাজিতার আরিফ- (১ম পর্ব)
- ২৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:১২
ভাগ্য পরিবতনের আশায় ২০২৩ সালের ২৭ ও ২৮ মার্চ ইন্ডিগো এয়ারলাইন্স এবং হিমালয়ান এয়ারলাইন্স যোগে শ্রমিক হিসেবে সৌদি আরবে পাড়ি জমান মোসাম্মাত রোজিনা (২২) এবং কবিতা নামের দুই নারী। একইভাবে ঐ বছরের এপ্রিল ও জুন মাসে ওজালা, সাবনুর, আকলিমা, ইয়াসমিনা এবং লাভলীসহ এমন ৮০ জন ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী অনেক তরুণীই দেশটিতে যান। কিন্তু কয়েকদিনের মাথায় তারা সবাই যেন অন্য কিছু মেনে নিতে বাধ্য হন। শেষতক টিকতে না পেরে মরুর দেশে ইজ্জত বিকিয়ে হলেও জীবন নিয়ে দেশে ফিরে আসতে আকুল হয়ে পড়েন তারা। সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও অন্য ভিন্ন অফিসের সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন তাদের কেউ কেউ। কিন্তু অধরা থেকে যান লাভলী, কবিতাদের ইজ্জত বিকে দেওয়ার মূল হোতা। তবে শেষ পর্যন্ত তদন্ত শেষে বেরিয়ে আসে সেই থলের বিড়ালের নাম।
জানা গেছে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর আড়ালে সৌদি আরবে নারী পাচার, অফিসের নারী কর্মীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করার চেষ্টা এবং মালয়েশিয়ায় নির্ধারিত খরচের দ্বিগুণ অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর একাধিক অভিযোগে রিক্রুটিং এজেন্সি ‘অপরাজিতা ওভারসিস’-এর (আরএল ১৩১৮) লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গত ১৯ জুলাই জারীকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত ‘অপরাজিতা ওভারসিস’র কর্ণধার মো. আরিফুর রহমান এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ওমান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও রোমানিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর কাজ করছেন। এরইমধ্যে ২০২৩ সাল থেকে ইউরোপের কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার স্বার্থে তিনি ‘রাবিড’ (রিক্রুটিং এজেন্সি অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশ ইউরোপ অ্যান্ড ডেভেলপ কান্ট্রি) নামে একটি পরিষদও চালু করেছিলেন। মূলত এই রাবিডের আড়ালে শত শত পাসপোর্টের টাকা সংগ্রহ করে ভিসার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে অবৈধ নারী পাচারই ছিল তার ব্যবসা। আইনের তোয়াক্কা না করে বিএমইটির স্মার্ট কার্ড ও সরকারি নিয়ম ছাড়াই শত শত নারীকে অবৈধভাবে ‘এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট’-এর মাধ্যমে সৌদি আরবে পাচার করাই ছিল তার মূল কাজ। যাদের অধিকাংশই বাধ্য হয়ে আরব মালিকদের নিকট নিজেদের ইজ্জত বিকিয়ে জীবন বাঁচাতে হয়। এভাবে কমপক্ষে কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি ও তার সংশ্লিষ্টরা। ২০২৩ সালে ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে থাকা মো. এনামুল নামের এক কর্মকর্তার সহায়তায় এসব অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএমইটি কার্ড ছাড়া কর্মী পাঠানো সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এটি মানব পাচারের একটি কৌশল। সরকারি ডাটাবেজে তথ্য না থাকায় সৌদি আরবে এ ধরনের কর্মীরা কোনো বিপদে পড়লে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও দ্রুত আইনি সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয় না। শুধু পাচারই নয়, সৌদি প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এলে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য অফিসের নারী কর্মীদের অনৈতিকভাবে বাধ্য করার ভয়ংকর অভিযোগ রয়েছে আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে। প্রস্তাবে রাজি না হলে নারী কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাসহ নানা উপায়ে হয়রানি করা হতো।
গত ১৪ মে এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক নারী কর্মী এলিনা জামান সৃষ্টি (৩০)। তিনি অভিযোগে জানান, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আট মাস ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকাকালীন আরিফুরের বিভিন্ন বেআইনি কর্মকাণ্ডের কথা জানতে পারেন এবং তাকেও একই কাজে বাধ্য করার জন্য মানসিক চাপ ও শারীরিক লাঞ্ছনা করা হয়। তার কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বিগত দুই বছর ধরে তিনি ও তার পরিবারকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় হেনস্তা করা হচ্ছে। যদিও সিআইডিসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তে সেই মামলাগুলো মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ওই নারী ও তার পরিবার প্রাণহানির হুমকির মুখে রয়েছেন।

এদিকে মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে কর্মী পাঠানোর খরচ (যখন চালু ছিল) তখন নির্ধারিত ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। অথচ আরিফুর কোম্পানির ভিসার জন্য নিতেন ১ লাখ ৫০ হাজার এবং কৃষি ভিসার জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া বিভিন্ন এজেন্সি থেকে মালয়েশিয়ার কাজের জন্য ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৬, ৪২০, ৩৮৫, ৩৮৬, ৪২৭ এবং ৩৪ ধারায় অপরাজিতা ওভারসিসসহ ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল ও গৃহীত হয়েছে। এই ধারাগুলোর আওতায় অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, এবং মারাত্মক ক্ষতির ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক অর্থ বা সম্পত্তি আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
এসব বিষয়ে অভিযুক্ত মো. আরিফুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে তার আইনজীবির দেওয়া এক লিখিত বক্তব্য পাঠান। এতে তিনি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে বলেন, প্রতিষ্ঠানের (অপরাজিতা ওভারসীজ) সাবেক হিসাব রক্ষক এলিনা জামান সৃষ্টি-এর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের কিছু আর্থিক লেনদেন ও হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি অডিট, জিডি এবং পরবর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এ ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুরকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
হাজার কোটি টাকা লুটপাটের মামলা তদন্তে দুদক
এদিকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির নামে আট হাজার কোটি টাকা লুটপাটের মামলায় এবার শতাধিক এজেন্সির বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে দুদক। এ ঘটনায় গঠিত আলাদা আলাদা দলের সদস্যরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন।
সোমবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশি কর্মীদের কাছে মালয়েশিয়া যেন এক চিরচেনা আস্থার জায়গা। কিন্তু সেই আস্থাকে পুঁজি করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিন্ডিকেট বাণিজ্যে মেতে ওঠে ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সি। এসব এজেন্সির বিরুদ্ধে এরইমধ্যে আট হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগে ২৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এবার এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তে নেমে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে সংস্থাটি। এসময় ৫৪ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় ‘দি জিএমজি অ্যাসোসিয়েটস’ এর চেয়ারম্যান গোলাম মাওলাসহ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সংস্থাটি। পরে দুদক উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, সরকারি খরচ ৭৯ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও অতিরিক্ত সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে এজেন্সিগুলো।