আদানির ফাঁদে বাংলাদেশ, বিপর্যস্ত জনজীবন

আদানি

দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় চুলায় গ্যাসের সংকট, সিএনজি স্টেশনগুলোতে চাপ এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

গ্যাসের সংকটে ডায়িং ও নিটিং কারখানাগুলো দিনের বড় একটি সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এর মধ্যে গত ২৩ দিন ধরে উৎপাদনক্ষমতার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে ভারতের আদানি গ্রুপ। অথচ একই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। প্রচণ্ড গরমে নগর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে।

চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উদ্বেগ

চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে চলতি আগস্টে আদানি গ্রুপকে তিন দফা চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। প্রতিবারই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না।

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় আদানির ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। গত আড়াই বছরে সেখান থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও সর্বশেষ রোববার সরবরাহ নেমে আসে ৯১৫ মেগাওয়াটে।

পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, তীব্র গরমে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আদানির সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ জানতে আগস্টে তিনটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

কয়লা নিয়ে আদানির ব্যাখ্যা

পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, ৭ আগস্ট ভোর ৫টায় আদানি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে ১ হাজার ৪৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছিল। পরদিন ৮ আগস্ট সরবরাহ হঠাৎ কমে ৭৯০ মেগাওয়াটে নেমে যায়।

পিডিবিকে দেওয়া জবাবে আদানি কখনো কয়লা ভিজে যাওয়ার কথা জানিয়েছে, আবার কখনো কয়লা পরিবহণের রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে তিন দিনের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। মাঝেমধ্যে এক বা দুই দিন ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও পরে আবার তা কমে যাচ্ছে।

আদানির বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ

পিডিবি জানিয়েছে, কয়লার দাম নিয়ে আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে, যা অর্থনৈতিক আদালতের একজন মধ্যস্থতাকারীর কাছে বিচারাধীন। তবে বাংলাদেশের কাছে আদানির বিদ্যুৎ বিল বকেয়া নেই। গত মাসেও প্রতিষ্ঠানটিকে ৯ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা চুক্তির আওতায় ভারতের গড্ডায় আদানি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে। বাংলাদেশের জন্য দেশের বাইরে নির্ধারিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে এটিই একমাত্র।

পিডিবির কর্মকর্তাদের দাবি, ভারতের ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র সরেজমিনে পরিদর্শনের সুযোগ না থাকায় আদানি কয়লা ও উৎপাদনসংক্রান্ত যে তথ্য দিচ্ছে, সেটিই তাদের মেনে নিতে হচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন

বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কিছুটা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। তবে এর সঙ্গে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিদর্শন করতে পারলে সরবরাহ কমার প্রকৃত কারণ যাচাই করা সহজ হতো। বিষয়টি বিদ্যুৎ সচিবের নজরেও আনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তিতে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা এ চুক্তির কারণে দীর্ঘ ২৫ বছর বাংলাদেশকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

লোডশেডিং বেড়েছে

এদিকে সারা দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও অবনতির দিকে। রোববার দুপুর ১২টায় পিক আওয়ারে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট। গত মাসে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট।

বর্তমানে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। পায়রা থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ৫৬৫ মেগাওয়াটে। একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে।

এ ছাড়া আরএনপিএল থেকে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের পরিবর্তে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট এবং এসএস পাওয়ার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের পরিবর্তে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকায় সেখান থেকেও উৎপাদন কমেছে।

বরিশালের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রটিও স্বাভাবিক সময়ে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও বর্তমানে দিচ্ছে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট।

এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য জ্বালানি তেল কিনতে রোববার অর্থ মন্ত্রণালয় ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে জানা গেছে।