এলএনজি নিয়ে বাংলাদেশকে দুঃসংবাদ দিলো কাতার
- ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৫
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকায় তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে জারি করা ‘ফোর্স মেজার’ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মেয়াদ আরও বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। এর ফলে বাংলাদেশসহ ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশের জন্য অক্টোবর পর্যন্ত এলএনজি কার্গো বাতিল হতে পারে বলে ক্রেতাদের জানিয়েছে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানটি।
কাতারি সংবাদমাধ্যম দোহা নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারএনার্জির সরবরাহ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইতালি রয়েছে। কোনো অস্বাভাবিক বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিতে ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট দায় ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা থেকে সাময়িক অব্যাহতি পেয়ে থাকে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত সেপ্টেম্বরের পরও বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। একই সময়ে পাকিস্তানি ক্রেতাদের জানানো হয়েছে, অক্টোবর পর্যন্ত তাদের নির্ধারিত এলএনজি কার্গো বাতিলের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকতে পারে।
ইউরোপের ক্রেতারাও একই ধরনের নোটিশ পেতে শুরু করেছেন। এর আগে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইতালিতে কাতারের এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার খবর জানিয়েছিল।
ইতালির জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, কাতারএনার্জি দেশটিতে এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রাখার মেয়াদ নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এডিসনের জন্য নির্ধারিত আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো পাঠাতে পারবে না বলে কাতারএনার্জি তাদের জানিয়েছে। এ নিয়ে বাতিল হওয়া মোট কার্গোর সংখ্যা ২৯টিতে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতাদের বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে। কেউ অন্য জ্বালানিতে নির্ভরতা বাড়াচ্ছে, আবার কেউ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত বাড়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রধান এই নৌপথে এলএনজি পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কাতারএনার্জি গত মার্চে প্রথমবার ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এরপর প্রতি মাসে এর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বৈশ্বিক গবেষণা ফেলো অ্যান-সোফি করবেউ বলেন, রাজনৈতিক সমাধান বা সংশ্লিষ্ট প্রধান পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে। স্বাভাবিক রপ্তানি কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কাতারএনার্জির কাছেও সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ নেই। তাই প্রতি মাসে সরবরাহ স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে বিশ্ব এলএনজি বাজারেও বড় প্রভাব পড়েছে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে দেশটি ৫০৯টি কার্গো রপ্তানি করেছিল। ইউরোনিউজের হিসাবে, এই সংকটে কাতারের গ্যাস বিক্রি থেকে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার।
কাতারের সরবরাহ ঘাটতি কিছুটা পূরণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ। নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াতেও উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তবে এসব উদ্যোগেও বৈশ্বিক ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এশিয়ার কিছু দেশ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে বা বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। ইউরোপও স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনার পরিবর্তে মজুত গ্যাস ব্যবহার করছে।
গবেষক করবেউর মতে, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দীর্ঘদিন এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত। তুলনামূলকভাবে জাপান কম ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ দেশটি কাতার থেকে কম এলএনজি আমদানি করে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বড় অংশ তেল বা মার্কিন গ্যাসের দামের সঙ্গে যুক্ত।
তার ধারণা, এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ইরানে সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে কিছু তেলবাহী ট্যাঙ্কার এই জলপথ ব্যবহার করলেও এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল খুবই সীমিত। বিশেষায়িত এসব জাহাজের বিকল্প সহজে পাওয়া যায় না, ফলে সংঘাতের মধ্যে এগুলো আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী এবং কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সায়াদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছেন, রাস লাফানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা অন্তত ১৭ শতাংশ কমে গেছে।
সূত্র: দোহা নিউজ, ইউরোনিউজ