টানা দরপতন ঠেকাতে উদ্যোগ
- ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:০৮
টানা দরপতন, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট এবং শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়তে থাকায় দেশের পুঁজিবাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জরুরি বৈঠকে বসছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)।
আগামীকাল মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় ডিএসইর বোর্ডরুমে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি চলমান অস্থিরতা মোকাবিলায় ব্রোকারেজ হাউসগুলোর করণীয় নিয়েও আলোচনা হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে একের পর এক দরপতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে লেনদেন কমে যাওয়া এবং বাজারমূলধন কমার প্রবণতাও পরিস্থিতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলেছে। ফলে বাজারে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আড়াই মাসের সর্বনিম্ন সূচক
এর আগে রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়ে পুঁজিবাজার। ওইদিন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০৩ পয়েন্ট বা প্রায় ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৫৮ পয়েন্টে নেমে আসে। প্রায় আড়াই মাসের মধ্যে এটিই ছিল সূচকটির সর্বনিম্ন অবস্থান।
দিনটিতে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৮৯টি কোম্পানির মধ্যে ৩৪৮টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। বিপরীতে দর বেড়েছে মাত্র ২০টির। অর্থাৎ অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারে বিক্রির চাপ ছিল স্পষ্ট।
দরপতনের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রোববার ডিএসইতে মোট ৫৪৫ কোটি ২৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ১৭৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
একই দিনে ডিএসইর বাজারমূলধন প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমে ৬ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। সূচকের পতন, কম লেনদেন এবং বাজারমূলধন কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যেসব কারণে বিক্রির চাপ বাড়ছে
বাজারসংশ্লিষ্ট ও বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মন্দাভাবের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘায়িত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে তালিকাভুক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ আয় ও মুনাফা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এ ছাড়া সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি সংকটও বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে অনেকে নতুন করে বিনিয়োগের পরিবর্তে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে অপেক্ষার অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের তথ্য চেয়ে ডিএসই ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে একাধিক চিঠি দিয়েছে। পাশাপাশি কিছু ব্রোকারেজ হাউসে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য, কোনো কোম্পানির লেনদেন নিয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বড় বিনিয়োগকারীদের কেউ কেউ শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে নির্দিষ্ট কোম্পানির পাশাপাশি সামগ্রিক বাজারেও বিক্রির চাপ বাড়ছে।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান
তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে, পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু নেতিবাচক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তাদের মতে, নির্বাচনের পর নতুন সরকার এবং পুনর্গঠিত নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
সেই প্রত্যাশার কারণে একটি পর্যায়ে বাজার দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজারের মৌলিক পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হওয়ায় এখন বাজারে এক ধরনের সংশোধন দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে দরপতনের মাত্রা বাড়িয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে শুধু সূচক বাড়ানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো, কোম্পানিগুলোর মৌলিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
আগস্টেও বড় পতন
চলতি আগস্ট মাসেও পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য দরপতন দেখা গেছে। ওই মাসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২৯৭ দশমিক ৫০ পয়েন্ট বা ৫ শতাংশ কমে যায়।
একই সময়ে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে ৮৭৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। ফলে সূচকের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়াও বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈঠকে কী আলোচনা হতে পারে
এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবারের জরুরি বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। বৈঠকে সাম্প্রতিক দরপতনের কারণ, অস্বাভাবিক বিক্রির চাপ, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট এবং ব্রোকারেজ হাউসগুলোর করণীয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশেষ করে বিভিন্ন কোম্পানির লেনদেন নিয়ে তথ্য চাওয়া এবং তদন্তসংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রভাব বাজারে কীভাবে পড়ছে, সে বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক কমাতে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তা নিয়েও মতবিনিময় হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বৈঠক থেকে বাজারের বর্তমান অস্থিরতা কমাতে বাস্তবভিত্তিক করণীয় নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি অস্বাভাবিক বিক্রির কারণ চিহ্নিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা আসতে পারে।
সব মিলিয়ে টানা দরপতন ও লেনদেন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ডিএসই ও ডিবিএর এই জরুরি বৈঠকের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বাজারের বর্তমান অস্থিরতা কাটিয়ে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বৈঠক থেকে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।