মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আ.লীগের ৭ নেতার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

আওয়ামী লীগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সাত শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই মামলায় পাঁচ আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর ছয়জন হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিনটি কাউন্টে অভিযোগ আনা হয়। ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে নির্দেশ, উসকানি, সহিংসতার পরিকল্পনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে দমন-পীড়নের অভিযোগ করা হয়।

প্রথম কাউন্টে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেলে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ওবায়দুল কাদের। আন্দোলন দমনের নির্দেশ দিয়ে তিনি সাদ্দামকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এরপর ১৪ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দেওয়া বক্তব্যকে সমর্থন ও প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় কাদেরের বিরুদ্ধে। পরদিন ১৫ জুলাই ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে বক্তব্য দেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, এর মাধ্যমে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামতে এবং সহিংসতায় জড়াতে উসকানি দেওয়া হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, এসব বক্তব্য ও নির্দেশনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং বহু শিক্ষার্থী আহত হন।

১৬ জুলাই আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি কমানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একই দিনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দেওয়ার কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

প্রসিকিউশনের দাবি, ওই দিন চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় গুলিতে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুক নিহত হন। একই দিনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকজন আন্দোলনকারী নিহত হন।

দ্বিতীয় কাউন্টে অভিযোগ করা হয়, ১৭ জুলাই তেজগাঁওয়ে দলীয় কার্যালয়ে ঢাকা জেলা এবং ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতাদের আন্দোলন দমনে প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।

১৮ জুলাই ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পরদিন ১৯ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতাদের বৈঠক শেষে কারফিউ ও সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গে কাদেরের বক্তব্যকে ‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন।

এ ছাড়া শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা এবং তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা, অপহরণ, গুম, হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, এসব নির্দেশনার পর ১৮ থেকে ২০ জুলাই মিরপুর, মহাখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে বহু আন্দোলনকারী নিহত হন।

তৃতীয় কাউন্টে বলা হয়, ৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের দলীয় নেতাকর্মীদের পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশ দেন।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, এর পরদিন ৪ আগস্ট মিরপুর, ফেনীর মহিপাল ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুলিতে বহু আন্দোলনকারী নিহত হন। ৫ আগস্টও মিরপুর, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আরও বলা হয়, জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে সারা দেশে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি নিরীহ আন্দোলনকারী নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন।


বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমন, উসকানি, সহিংসতায় প্ররোচনা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে হামলা চালানোর অভিযোগ আনা হয়। ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদেরের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাহাউদ্দিন নাছিম। ওই সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের দমনে ছাত্রলীগকে মাঠে নামানোর বক্তব্য দেওয়া হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, সেখানে উপস্থিত থেকে নাছিম ওই বক্তব্যকে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে চট্টগ্রামে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহমেদ ও মো. ফারুক এবং রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ কয়েকজন আন্দোলনকারী নিহত হন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেন এবং ওবায়দুল কাদের ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা দেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাহাউদ্দিন নাছিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ।

নিজ জেলা মাদারীপুরেও আন্দোলন দমনে নাছিমের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে। সেখানে সাবেক মেয়র খালিদ হোসেনের মাধ্যমে তিনি পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক তদারক করতেন বলে দাবি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৮ জুলাই মাদারীপুরে দীপ্ত দে এবং ১৯ জুলাই তৌহিদ নিহত হন। এ ছাড়া সেখানে বহু আন্দোলনকারী আহত হন।

৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদেরের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকেও বাহাউদ্দিন নাছিম আন্দোলন দমনের নির্দেশকে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

পরদিন ৪ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন অপবাদে চিহ্নিত করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় নাছিমের বিরুদ্ধে। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই বক্তব্যের পর রাজধানীর বাংলামোটর ও পল্টন এলাকায় কয়েকজন আন্দোলনকারী নিহত হন।

অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্টও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে, গুলিস্তান, বাংলামোটর ও চাঁনখারপুলসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গুলিতে কয়েকজন আন্দোলনকারী নিহত হন।

প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে সারা দেশে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর আহত করা হয়।

মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে উসকানি, সহিংসতার পরিকল্পনা ও নির্দেশনা এবং গণমাধ্যমের সম্প্রচার বন্ধের অভিযোগ আনা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই তেজগাঁওয়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই—এমন বক্তব্যসহ বিভিন্ন উসকানিমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য দেন আরাফাত। পরদিন ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের সময় তিনি উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্য দেন আরাফাত এবং হামলার নির্দেশ দেন। এর পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

১৯ জুলাই এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করার অভিযোগ রয়েছে আরাফাতের বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্ত্র ও গুলি মজুত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি হুমকিমূলক বক্তব্য দেন বলে অভিযোগে বলা হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আরাফাতের নির্বাচনী এলাকা মহাখালী রেলক্রসিং ও চৌরাস্তা এলাকায় ১৯ জুলাই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ দলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা হামলা চালিয়ে মো. শাহজাহান, গনি মিয়াসহ ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে। এসব ঘটনার সার্বিক তত্ত্বাবধানে আরাফাত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় আন্দোলন দমন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আরাফাত বিভিন্ন বক্তব্য দেন। আন্দোলন দমনে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সহিংসতার খবর প্রচারের কারণে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করার কথাও ওই আলাপচারিতায় উঠে আসে বলে প্রসিকিউশনের দাবি।

তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আরাফাত ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় সংবাদ বুলেটিন চলাকালে বাংলা ভিশন, দেশ টিভি, চ্যানেল ২৪ ও এনটিভির সম্প্রচার এবং ২২ জুলাই বাংলা ভিশন ও চ্যানেল ২৪-এর সম্প্রচার ৩০ মিনিটের জন্য বন্ধ করে দেন বলেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

৪ আগস্ট আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেওয়ার পর সংসদ ভবন এলাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আরাফাত আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং আন্দোলনকে সহিংস কর্মকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ করা হয়।

প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, এসব নির্দেশনা ও পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই-আগস্টে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে সারা দেশে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারী নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন।


পরশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা অনুযায়ী আন্দোলন দমনে তার নিয়ন্ত্রিত যুবলীগকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন তিনি।

অভিযোগে বলা হয়, পরশের নির্দেশনা অনুসরণ করে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। এসব হামলায় ছাত্র-জনতা নিহত ও গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের দাবি, আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪–দলীয় জোটের বিভিন্ন সশস্ত্র কর্মী-সমর্থকদের হামলায় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি ছাত্র-জনতা নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। এসব ঘটনায় অন্যতম নির্দেশদাতা ও নেতৃত্বদানের ভূমিকায় পরশ ছিলেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ১৮ জুলাই যুবলীগের নেতা-কর্মীরা চট্টগ্রাম মহানগরে গুলি চালিয়ে তানভীর ছিদ্দিকী, সায়মন মাহিন ও হৃদয় চন্দ্র তরুয়াকে হত্যা করেন। পরদিন ১৯ জুলাই রাজধানীর মহাখালী এলাকায় শাহাজাহান, গণি মিয়া, আল আমিন রনি, জাহিদ হোসেন, ইমাম মেহেদী হাসান ও মামুন হোসেন নিহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে এক বক্তব্যে পরশ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে ‘আগ্রাসন’ ও ‘ধ্বংসলীলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। একই বক্তব্যে তিনি জামায়াত নিষিদ্ধের সম্ভাব্য ঘোষণার পর সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৪–দলীয় জোটের বৈঠকের আগেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে পরশের বক্তব্য আন্দোলন দমনের ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ৪ আগস্ট পরশের অধীন যুবলীগের নেতা-কর্মীরা লক্ষ্মীপুর শহরে গুলি চালিয়ে সাদ-আল আফনান, ওসমান পাটোয়ারী, সাব্বির হোসেন ও কাওসারকে হত্যা করেন। পরদিন ৫ আগস্ট রাজশাহী মহানগরে যুবলীগের নেতা-কর্মীদের হামলায় আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম নিহত হন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাইনুলের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

মাইনুল হোসেন খানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১২ জুলাই সিলেট সিটি করপোরেশনের একটি অনুষ্ঠানে তিনি আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করেন এবং আন্দোলন প্রতিহত করতে যুবলীগের নেতা-কর্মী ও অনুসারীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।

অভিযোগে বলা হয়, ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা ও প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯ জুলাই মাইনুল নিজে অস্ত্র হাতে মিরপুর এলাকায় অবস্থান নেন। সেদিন আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণে তিনি জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ওই দিন বিকেলে মাইনুলের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় মিরপুরে গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়।

এ ছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, মাইনুলের উপস্থিতি ও তত্ত্বাবধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র নেতা-কর্মীরা ৪ আগস্ট মিরপুরে শাহরিয়ার হাসানসহ ১২ জন এবং ৫ আগস্ট মাহফুজুল আলমসহ ২০ জনকে হত্যা করেন।

তার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।

সাদ্দামের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, সাদ্দাম হোসেন ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের এক জমায়েতে আন্দোলনকারীদের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি ও উসকানি দেন।

‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন’—ওবায়দুল কাদেরের এমন নির্দেশনা বাস্তবায়নে সারা দেশে ছাত্রলীগ নামধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্ররোচনা ও নির্দেশ দেন সাদ্দাম। এ ছাড়া তিনি আন্দোলন দমনে দলীয়ভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও অর্থ গ্রহণ করেন।

১৫ জুলাই সাদ্দামের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় বহিরাগত যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। এ হামলায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি, ঢাকা কলেজের কমিটির সদস্যরা সরাসরি জড়িত ছিলেন।

‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’—ওবায়দুল কাদেরের এমন প্ররোচনা ও নির্দেশনা মোতাবেক সাদ্দাম ছাত্রলীগকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মহানগর, জেলা ও উপজেলায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন এবং তদারক করেন।

১৫ জুলাই সাদ্দাম ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। ১৬ জুলাই আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন সাদ্দাম। তাঁর এমন বক্তব্যের পর রাজধানীসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর হামলা চালায়। ১৬ জুলাই সারা দেশে ৬ জন নিহত হন। তার পরদিন সারা দেশে চার শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ১৮ জুলাই নির্বিচার গুলি করে, যাতে সারা দেশে ২৩ জন নিহত হন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সাদ্দামের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তদারকিতে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সারা দেশে হামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বিভিন্ন পরিকল্পনা করেন, নির্দেশনা দেন এবং অর্থ গ্রহণ করেন। ১৩ জুলাই মধুর ক্যানটিনে তিনি হিংসাত্মক, বিদ্বেষ ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার জন্য আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি দেখান তিনি।

১৫ জুলাই আসিফ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য নির্দেশ দেন। তাঁর নেতৃত্বে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি, ঢাকা কলেজের কমিটির সদস্যরা হামলা চালান।

১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দাম আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার যে হুমকি দেন, তা সেখানে উপস্থিত থেকে সমর্থন করেন আসিফ। সেদিন সারা দেশে ছয়জন নিহত হন।

১৮ জুলাই ছাত্রলীগসহ অন্যদের হামলায় দেশে ২৩ জন নিহত হন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে আসিফের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তদারকিতে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সারা দেশে হামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে।