আজ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করার দিন
- ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:১৮
সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ নেই, নেই তীব্র যানজট। কেউ হাঁটছেন, কেউ বাসে, আবার কেউ সাইকেলে ছুটছেন গন্তব্যের দিকে—রাজধানীবাসীর কাছে এমন দৃশ্য অনেকটা স্বপ্নের মতো। ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এমন পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দিবসটি পালিত হচ্ছে। দেশে ২০১৬ সাল থেকে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
দিবসটির লক্ষ্য শুধু এক দিনের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি বন্ধ রাখা নয়। বরং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার ও নির্ভরতা কমানো, যানজট ও বায়ু-শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহন ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
ঢাকার সড়কে গাড়ির চাপ
রাজধানী ঢাকার সড়কে প্রতিদিন ৪০ লাখের বেশি যানবাহন চলাচল করে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ হলেও এসব গাড়ি সড়কের প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা দখল করে বলে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অল্পসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সড়কের বড় অংশ ব্যবহৃত হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষকে গণপরিবহনেই চলাচল করতে হয়। এর প্রভাব পড়ে যানজট ও নগরজীবনে।
বুয়েটের গবেষণার বরাত দিয়ে আয়োজকেরা জানান, ঢাকার যানজটের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। পাশাপাশি যানবাহন থেকে সৃষ্ট দূষণের কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
‘কম গাড়ি, বাসযোগ্য নগরী’
বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ধানমন্ডি সাতমসজিদ সড়কের আবাহনী খেলার মাঠের সামনে ‘কম গাড়ি, বাসযোগ্য নগরী’ শীর্ষক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং যান্ত্রিক যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার কারণে ঢাকা ক্রমেই যানজটনির্ভর নগরীতে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে গণপরিবহন, হাঁটা ও সাইকেল ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে।
বক্তারা জানান, ঢাকার প্রায় ৭৬ শতাংশ যাতায়াত দুই কিলোমিটারের মধ্যে। এসব স্বল্প দূরত্বে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে অনেক মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে হেঁটে যাতায়াতে উৎসাহিত হতে পারেন।
জ্বালানির দামেও বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়
কর্মসূচিতে সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। বক্তাদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন ব্যয় নয়, মানুষের সামগ্রিক পারিবারিক ব্যয়ের ওপরও চাপ পড়ে।
তাই ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি গণপরিবহন, হাঁটা ও সাইকেল ব্যবস্থাকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা। এতে জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি যানজট ও দূষণ কমানো সম্ভব বলে মনে করেন আয়োজকেরা।
যে বিষয়গুলোতে গুরুত্ব
বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে কর্মসূচিতে বাস, রেল ও নৌযানের মধ্যে সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং স্কুল, বাসাবাড়ি ও বাজারের মতো ব্যস্ত এলাকায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহনের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়।
এক দিনের কর্মসূচি নয়
আয়োজকদের মতে, বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসের মূল লক্ষ্য শুধু একটি দিন ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করা নয়। বরং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজন অনুযায়ী হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহন ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করা।
বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে যানজট, জ্বালানি খরচ ও দূষণ কমানোর পাশাপাশি নগরজীবন আরও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
যেভাবে বিশ্ব গাড়িমুক্ত দিবসের শুরু
বিশ্ব গাড়িমুক্ত দিবস কোনো একক আন্তর্জাতিক সংস্থার ঘোষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং নাগরিক, পরিবেশ ও টেকসই পরিবহন আন্দোলনের ধারাবাহিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এটি আন্তর্জাতিক দিবসের রূপ পেয়েছে। এ দিবসের বিকাশে ইউরোপীয় কমিশনের ‘কার-ফ্রি ডে’ উদ্যোগ এবং কার বাস্টার্স—পরবর্তী সময়ে ‘ওয়ার্ল্ড কার-ফ্রি নেটওয়ার্ক’—এর বৈশ্বিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জার্মানি থেকে প্রকাশিত ‘সাসটেইনেবল ট্রান্সপোর্ট সোর্সবুক’-এ গাড়িমুক্ত নগর উন্নয়নের আধুনিক ধারণার সূত্রপাত ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের বিভিন্ন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এসব গবেষণায় অনিয়ন্ত্রিত মোটরযান ব্যবহারের সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
তবে আধুনিক গাড়িমুক্ত আন্দোলনের বড় অনুঘটক ছিল সত্তরের দশকের তেলসংকট। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো সরবরাহ সীমিত করলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব পড়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ওপরও। বিভিন্ন দেশে তখন জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য গাড়ি চলাচল সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৭৩ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে তেলসংকটের প্রেক্ষাপটে সুইজারল্যান্ডে কয়েকটি ‘গাড়িমুক্ত রোববার’ পালন করা হয়। আধুনিক গাড়িমুক্ত আন্দোলনের শুরুর দিকের উদ্যোগগুলোর মধ্যে এটিকে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অবশ্য তখন এর মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালানি সাশ্রয় ও সংকট মোকাবিলা।
পরবর্তী সময়ে গাড়িমুক্ত আন্দোলনের উদ্দেশ্য আরও বিস্তৃত হয়। বায়ু ও শব্দদূষণ কমানো, যানজট নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মানুষকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনাও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
নব্বইয়ের দশকে গতি পায় আন্দোলন
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে গাড়িনির্ভর নগরজীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রথম আন্তর্জাতিক ‘অটো-ফ্রি সিটিজ’ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরিবহন বিকল্প নিয়ে কাজ করা সংগঠন ট্রান্সপোর্টেশন অলটারনেটিভস এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
১৯৯২ সালের মার্চে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে একটি গণভোটে ৫২ শতাংশ ভোটার শহরটিকে গাড়িমুক্ত করার পক্ষে মত দেন। এরপর ১৯৯৪ সালের অক্টোবরে স্পেনের তোলেদোতে অনুষ্ঠিত ‘অ্যাকসেসিবল সিটিজ’ কংগ্রেসে নিয়মিত গাড়িমুক্ত দিবস আয়োজনের প্রস্তাব ও কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়।
১৯৯৬ সালের মে মাসে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ইউরোপের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের আন্তর্জাতিক বৈঠক থেকে ‘কোপেনহেগেন ঘোষণা’ দেওয়া হয়। এতে ‘কার-ফ্রি সিটিজ’ নেটওয়ার্ক গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
একই বছরের জুনে আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকে প্রথম গাড়িমুক্ত দিবস পালিত হয়। ওই মাসেই যুক্তরাজ্যের বাথ শহরেও এমন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের কয়েকটি শহরে এনভায়রনমেন্টাল ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে গাড়িমুক্ত দিবস পালিত হয়। একই বছর ফ্রান্সের লা রোশেল শহরেও প্রথমবারের মতো দিবসটি আয়োজন করা হয়।
২২ সেপ্টেম্বর যেভাবে নির্ধারিত হলো
বিশ্ব গাড়িমুক্ত দিবসের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে। ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর দেশটিতে প্রথম জাতীয় পর্যায়ে গাড়িমুক্ত দিবস পালিত হয়। ‘শহরে, আমার গাড়ি ছাড়া?’ শিরোনামের এই কর্মসূচিতে অংশ নেয় ৩৪টি শহর।
ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা নিয়ে মানুষকে ভাবতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বায়ু ও শব্দদূষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, হাঁটা ও সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়ানো ছিল এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে গাড়ি ছাড়া শহরের রাস্তা কেমন হতে পারে, সেই অভিজ্ঞতাও দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
১৯৯৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ফ্রান্স ও ইতালির বহু শহর সমন্বিতভাবে গাড়িমুক্ত দিবস পালন করে। এতে ফ্রান্সের ৬৬টি এবং ইতালির ৯২টির বেশি শহর অংশ নেয়। পরবর্তী সময়ে এই উদ্যোগ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইন টাউন উইদাউট মাই কার’ কর্মসূচির ভিত্তি তৈরি করে।
এর ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় কমিশন প্রথমবারের মতো ইউরোপজুড়ে ‘ইউরোপিয়ান কার-ফ্রি ডে’ আয়োজন করে। একই বছর কার বাস্টার্স বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যক্তি ও সংগঠনকে ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব গাড়িমুক্ত দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানায়।
ওয়ার্ল্ড কার-ফ্রি নেটওয়ার্কের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপের গাড়িমুক্ত দিবসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২২ সেপ্টেম্বরকে বিশ্বব্যাপী গাড়িমুক্ত দিবস পালনের দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
এরপর বিভিন্ন দেশে ২২ সেপ্টেম্বরকে কেন্দ্র করে গাড়িমুক্ত দিবস পালনের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে। ২০০১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বের ৩৩টি দেশের এক হাজারের বেশি শহর আন্তর্জাতিক গাড়িমুক্ত দিবসের কর্মসূচিতে অংশ নেয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারো শহরে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।