ভারতে স্বমীর লাশ নিয়ে ৮ দিন হয়রানির শিকার বাংলাদেশি নারী
- ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:১৪
ভারতের বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্বামীর মৃত্যুর পর আট দিন মরদেহ নিয়ে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন এক বাংলাদেশি নারী। চিকিৎসার বকেয়া ৩৫ দশমিক ৭৯ লাখ রুপি পরিশোধ না করায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর স্বামীর মরদেহ ও পাসপোর্ট আটকে রেখেছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
২৬ বছর বয়সী ওই নারী জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য চাপ দেয় এবং মরদেহ ও তাঁর পাসপোর্ট আটকে রাখে। এ অবস্থায় আট দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেনদরবার করতে হয় তাঁকে।
পরে বিষয়টি নিয়ে তিনি বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তা চান। হাইকমিশনের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত শনিবার স্বামীর মরদেহ ও নিজের পাসপোর্ট বুঝে পান ওই নারী। ঘটনার বিস্তারিত ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
নওগাঁর ২৬ বছর বয়সী তানজিলা ইসলাম আশা ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ কে জানান, তার স্বামী মোহাম্মদ আবদুল হাকিম শাবুজ (৩২) বাংলাদেশের একজন চুক্তিভিত্তিক সরকারি শিক্ষক। কিডনির চিকিৎসার জন্য গত ৫ সেপ্টেম্বর তারা বেঙ্গালুরু যান। পরদিন তীব্র বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে শাবুজকে ওল্ড এয়ারপোর্ট রোডের মণিপাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং আইসিইউতে নেওয়া হয়।
আশা জানান, পরবর্তী কয়েক দিনে শাবুজের একাধিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করা হয়। সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় ১৪ সেপ্টেম্বর তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়। এরপর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে এবং ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১টার দিকে তিনি মারা যান।
আশা বলেন, ‘চিকিৎসার সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যখনই টাকা চেয়েছে, তখন কিস্তিতে মোট ৭.৫ লাখ রুপি পরিশোধ করেছি। স্বামীর মৃত্যুর পর মরদেহ কীভাবে বাংলাদেশে নিয়ে যাব, তা নিয়ে চিন্তা করছিলাম। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩৫.৭৯ লাখ রুপি পরিশোধ করতে বলে এবং টাকা না দিলে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে না বলে জানায়।’
তিনি অভিযোগ করেন, পরিশোধ করা ৭.৫ লাখ রুপির কোনো রসিদ হাসপাতাল তাকে দেয়নি। এমনকি চিকিৎসার সম্ভাব্য ব্যয় বা বকেয়া টাকার বিষয়েও আগে তাকে কিছু জানানো হয়নি।
আশা বলেন, ‘আমি পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। আট দিন মরদেহ আটকে রাখার পাশাপাশি আমার পাসপোর্টও রেখে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানাই এবং সহায়তার জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। শেষ পর্যন্ত শনিবার বকেয়া শূন্য দেখিয়ে তারা মরদেহ হস্তান্তর করে।’
পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ও শাবুজের বন্ধু মোহাম্মদ মোক্তাদির হোসেন তার পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে বেঙ্গালুরু যান। তিনি জানান, স্থানীয় কয়েকজন কর্মীর সহায়তায় শুক্রবার আশা তার পাসপোর্ট ফেরত পান এবং মরদেহ দেশে নেওয়ার প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। তিনি বলেন, আগে পরিশোধ করা ৭.৫ লাখ রুপি ছাড়া আশা আর কোনো অর্থ দেননি।
যোগাযোগ করা হলে মণিপাল হাসপাতালের এক কর্মকর্তা শনিবার মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে আশার অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পরে এক বিবৃতিতে হাসপাতাল জানায়, শাবুজ গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসেন। তার শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি ধরা পড়ার পর তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে তার হৃদ্যন্ত্র দুবার বন্ধ হয়ে যায় এবং চিকিৎসকরা তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। পরে তাকে ইসিএমও ও ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়।
হাসপাতাল আরও জানায়, পরীক্ষায় শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমাট ও রক্তনালিতে বাধা ধরা পড়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পালমোনারি থ্রম্বোএন্ডার্টেরেকটমি করা হয়। হাসপাতালের ভাষ্য, নিবিড় পরিচর্যা ও সার্জারি দলের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শাবুজ তার অসুস্থতার কাছে হার মানেন।