রিপাবলিকানদের ভরাডুবির নেপথ্যে দায় কার?

রিপাবলিকান

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের নিজের পক্ষে টানতে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি ভোটারদের প্রতি তাঁর আহ্বান ছিল, ব্যালটে যেন তিনি নিজেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন-এমন বিবেচনায় ভোট দিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের মনোনয়নেও সরাসরি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল তাঁর সেই রাজনৈতিক কৌশলকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া একাধিক প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। এর ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে নেতৃত্ব, কৌশল ও জনসমর্থন নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সাউথ ক্যারোলিনা, নর্থ ক্যারোলিনা, টেক্সাস ও মিশিগানে ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থীদের পরাজয়কে শুধু কয়েকটি আসনের নির্বাচনী ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং তাঁর সমর্থিত প্রার্থীদের প্রতি ভোটারদের সমর্থনের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, স্থানীয় নেতৃত্বকে উপেক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষও নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের মাধ্যমে রিপাবলিকান পার্টিকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে গড়ে তুলেছেন ট্রাম্প। দলীয় প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণ-প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেসব রক্ষণশীল নেতা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্যের প্রশ্নে তাঁর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি, তাঁদের অনেকেই দলীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিতি, সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীদের পরিবর্তে ট্রাম্প অনেক ক্ষেত্রে নিজের রাজনৈতিক অনুগতদের মনোনয়ন পেতে সহযোগিতা করেছেন। তাঁর ধারণা ছিল, নিজের জনপ্রিয়তা ও সমর্থকদের ভোটের শক্তি দিয়ে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। কিন্তু এবারের নির্বাচনী ফলাফল সেই হিসাবের সঙ্গে মেলেনি।

চার অঙ্গরাজ্যে বড় ধাক্কা

রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক এসেছে সাউথ ক্যারোলিনা থেকে। ঐতিহাসিকভাবে রাজ্যটি রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৮ সালের পর সেখানে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি। এমনকি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প রাজ্যটিতে ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। সেই রাজ্যেই ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুস। ডারলিন গ্রাহাম প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন।

নর্থ ক্যারোলিনাতেও ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলি পরাজিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর রয় কুপারের কাছে। হোয়াটলি রিপাবলিকান পার্টির সাবেক জাতীয় প্রচার কর্মকর্তা হলেও নির্বাচনে সেই পরিচিতি তাঁকে জয় এনে দিতে পারেনি।

টেক্সাসের পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে দলীয় প্রাইমারি নির্বাচনে ট্রাম্প সরাসরি হস্তক্ষেপ করে দীর্ঘদিনের পরিচিত ও তুলনামূলক নিরাপদ প্রার্থী সিনেটর জন করনিনের পরিবর্তে অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। প্যাক্সনকে ঘিরে বিভিন্ন বিতর্ক ও কেলেঙ্কারির অভিযোগ থাকলেও ট্রাম্প তাঁকে এগিয়ে নেন। শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস ট্যালারিকোর কাছে রিপাবলিকান প্রার্থীর পরাজয় ঘটে। এর ফলে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে যায়।

মিশিগানেও একই চিত্র দেখা গেছে। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। এর মধ্য দিয়ে এল-সায়েদ মার্কিন সিনেটে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম মুসলিম হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন।

জনপ্রিয়তায় ভাটা, নীতির প্রভাব

নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল রিপাবলিকান শিবিরে। রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপে দেখা যায়, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার পরবর্তী সময়ের তুলনায় নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও নিচে নেমে গিয়েছিল। ফলে দলের নেতাদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়, দলীয় রাজনীতিতে ট্রাম্পের একচ্ছত্র প্রভাবই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে শুল্কনীতি, ইরান যুদ্ধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে সাধারণ ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অভিজ্ঞ রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডৌ হাই নির্বাচনী পরিস্থিতিকে ‘ট্রাম্প-কম্পন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ট্রাম্প পুরো বছর নিজের কাছে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়েই কথা বলেছেন; কিন্তু ভোটারদের কাছে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, সেটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেননি।

জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও প্রশাসনের নীতিগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার ব্যবধান তৈরি হয়েছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নির্বাচনের ফলাফল আসতে শুরু করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্প। তিনি লেখেন, ‘আমি তো ব্যালটে ছিলাম না! আর যদি থাকতাম, তবে আমরা ভূমিধস জয় পেতাম!’ তাঁর এই বক্তব্যে নির্বাচনী পরাজয়ের দায় নিজের জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক কৌশলের ওপর না দিয়ে ব্যালটে নিজের অনুপস্থিতির বিষয়টি সামনে আনার প্রবণতা দেখা যায়।

তবে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে নির্বাচনের আগে থেকেই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্প নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের নিজেদের প্রচারণার চেয়েও বেশি প্রচার করেছেন। অন্য এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে প্রশাসনের কাছে থাকা জরিপে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে দেশজুড়ে কয়েক সপ্তাহের প্রচার চালান।

নিজেদের হাতেই আসন হারানোর অভিযোগ

স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের পেছনে ট্রাম্পের দলীয় মনোনয়ন কৌশল বড় ভূমিকা রেখেছে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক থমাস কান বলেন, টেক্সাসের প্রাইমারি নির্বাচনে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের ফলে দলটি একটি নিরাপদ আসন হারিয়েছে। তাঁর মতে, জন করনিনকে মনোনয়ন দেওয়া হলে রিপাবলিকানদের জন্য আসনটি ধরে রাখা সহজ হতো।

নর্থ ক্যারোলিনার ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধ্যাপক কান। প্রেসিডেন্টের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিলে মেডিকেডের বাজেট কমানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন তৎকালীন রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস। এর জেরে ট্রাম্প তাঁকে প্রাইমারি নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ করার হুমকি দিয়েছিলেন। দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে এই বিরোধের পর গত বছর টিলিস ঘোষণা করেন, তিনি আর পুনর্নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না।

কানের মতে, টিলিস নির্বাচনে অংশ নিলে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্তও ভিন্ন হতে পারত। ফলে রিপাবলিকানরা কার্যত নিজেদের সিদ্ধান্তের কারণেই আসনটি হাতছাড়া করেছে।

নর্থ ক্যারোলিনার সাবেক রিপাবলিকান গভর্নর প্যাট ম্যাকক্রোরিও দলীয় প্রাইমারি নির্বাচনে ট্রাম্পের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে ট্রাম্প নিজেই রিপাবলিকান শিবিরে বিভক্তি বাড়িয়েছেন।

ম্যাকক্রোরি বলেন, সাউথ ক্যারোলিনায় প্রেসিডেন্ট স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী দুই কংগ্রেস সদস্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এতে দলীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর ভাষায়, একজন প্রেসিডেন্ট নিজের রাজনৈতিক পুঁজি নিজের দলের বিরুদ্ধেই ব্যয় করেছেন।

তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে

তবে ম্যাকক্রোরির উদ্বেগের জায়গা শুধু প্রার্থী বাছাই বা দলীয় কোন্দলে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি ছিল শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের সক্ষমতা। এই জনগোষ্ঠীর সমর্থনই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই যোগাযোগে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

ম্যাকক্রোরি বলেন, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে ট্রাম্পের এক ধরনের সহজাত যোগাযোগ ছিল, যা তাঁর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। দুঃখজনকভাবে তিনি সেই দক্ষতা হারিয়েছেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাঁর উচিত দ্রুত সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেই সংযোগ ফিরিয়ে আনা।

সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল রিপাবলিকান পার্টির সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দলীয় মনোনয়ন কি স্থানীয় নেতৃত্ব ও ভোটারদের প্রত্যাশার ভিত্তিতে হবে, নাকি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত পছন্দই সেখানে প্রধান বিবেচ্য থাকবে? অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ মোকাবিলায় দল কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে? আর ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কি সব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য সমানভাবে ভোটে রূপান্তরিত হবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় এসব প্রশ্নই এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফল অন্তত একটি বিষয় সামনে এনেছে-প্রেসিডেন্টের সমর্থন দলীয় প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই নির্বাচনী সাফল্যের একমাত্র নির্ধারক নয়। স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, দলীয় ঐক্য এবং ভোটারদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক উদ্বেগও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।