সাংবাদিককে অপহরণ, জিম্মি করে টাকা লুট
- নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৩ PM , আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৩ PM
ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে রাজধানীর পোস্তগোলা এলাকা থেকে এক সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গভীর জঙ্গলে আটকে রাখা এবং তাঁর ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অপহরণকারী চক্র তাঁকে একটি জঙ্গলে নিয়ে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক।
ঘটনার শিকার সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু জাতীয় দৈনিক এদিন'র বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। এ ঘটনায় তিনি গতকাল ঢাকার সিএমএম আদালতে অপহরণের অভিযোগে মামলা করেছেন। মামলায় ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
মামলার অভিযোগ ও ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ‘মামুন শেখ’ নামে একটি আইডির সঙ্গে কামরুজ্জামান বাবলুর পরিচয় হয়। প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা হলেও একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হিসেবে পরিচয় দেন। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি বিটকয়েনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’ দেওয়ার কথা বলেন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার ঢাকায় আসার কথা জানিয়ে মামুন শেখ সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলুকে দেখা করার প্রস্তাব দেন। সাংবাদিক তাঁকে অফিসে আসতে বললেও মামুন জানান, তিনি জুরাইনে আত্মীয়ের বাসায় রয়েছেন। পরে জুরাইনে এসে দেখা করার অনুরোধ করলে কামরুজ্জামান বাবলু সেখানে যান।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুপুর আড়াইটার দিকে পোস্তগোলা ব্রিজসংলগ্ন আলম মার্কেটের সামনে তাঁদের দেখা হয়। এ সময় মামুন তাঁর বন্ধু ‘অনিক’ নামে একজনের সঙ্গে সাংবাদিককে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে নিরিবিলি পরিবেশে কথা বলার কথা বলে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসের কাছে নেওয়া হয়। প্রথমে গাড়িতে উঠতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও তাঁদের পীড়াপীড়িতে তিনি গাড়িতে ওঠেন।
গাড়িতে ওঠার পরই পরিস্থিতি বদলে যায় বলে অভিযোগ করেছেন কামরুজ্জামান। তাঁর ভাষ্য, গাড়ির ভেতরে আগে থেকেই আরও তিনজন অবস্থান করছিলেন। তিনি গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রের মুখে তাঁকে চুপ থাকতে বলা হয়। পরে তাঁর হাত ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়ে গাড়িটি নিয়ে অজ্ঞাত স্থানের উদ্দেশে রওনা হয় অপহরণকারীরা।
কামরুজ্জামানের অভিযোগ, প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা গাড়িতে নেওয়ার পর তাঁকে একটি গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন মাগরিবের আজান হচ্ছিল। চারপাশে অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা পাহারা দিচ্ছিলেন। সেখানে তাঁকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও গালিগালাজ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁকে বলা হয় তিনি সরকারের বিরুদ্ধে এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করেন। একই সঙ্গে তাঁর কাছে বিভিন্ন তথ্য চাওয়ার বিষয় নিয়েও অপহরণকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার কথা উল্লেখ করে ভয় দেখানো হয় এবং হত্যার পর তাঁর মরদেহের মাংস মাছকে খাওয়ানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু।
এ সময় তাঁর মোবাইল ফোন, ব্যাংকের কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র নিয়ে নেয় অপহরণকারীরা। তাঁর সঙ্গে বাইরের কারও যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, রাত ৯টার দিকে তাঁর স্ত্রী ফোন করলে অপহরণকারীরা তাঁকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে বাধ্য করে। তবে কথাবার্তার মধ্যেই তাঁর স্ত্রী পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন। পরে তিনি কামরুজ্জামানের বড় ভাইদের বিষয়টি জানান। স্বজনরা পল্টন থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালে থানার এসআই তুষার দেবনাথ সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
কামরুজ্জামানের ভাষ্য, রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে পুলিশ তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও অপহরণকারীরা তাঁকে ফোন ধরতে দেয়নি। পরে রাত আড়াইটার দিকে তাঁদের উপস্থিতিতেই তিনি স্ত্রীর সঙ্গে এবং পুলিশের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, অপহরণকারীরা তাঁর ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করে। ব্যাংক হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী। পরে তাঁকে আরও টাকা দিতে চাপ দেওয়া হয়। তাঁর নিজের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
কামরুজ্জামান জানান, তাঁর মোবাইল ফোনটি তখনও অপহরণকারীদের কাছে ছিল। মোবাইল ফোনটি পরে আর তাঁর কাছে ফেরত দেওয়া হয়নি। তবে ফোনটির আইএমইআই নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য তাঁর কাছে রয়েছে।
ঘটনার শেষ পর্যায়ে অপহরণকারীরা কয়েকজন মিলে কী করা হবে তা নিয়ে আলোচনা করছিল। এ সময় ভোর হয়ে গেলে ফজরের আজানের সুযোগে কামরুজ্জামান জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে সরে যান। একপর্যায়ে দৌড়ে তিনি একটি প্রধান সড়কে উঠে আসেন। অপহরণকারীরা তাঁকে দেখতে না পাওয়ায় তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
পরে একটি পিকআপভ্যান থামিয়ে চালককে বিস্তারিত জানালে তাঁকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। ওই পিকআপের চালক তাঁকে বাগেরহাটের মোল্লাহাট এলাকায় নামিয়ে দেন। সেখানে একটি কাউন্টারে গিয়ে তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে স্বজনদের সহায়তায় ঢাকায় ফিরে আসেন তিনি।
এ ঘটনায় নিজের ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, বিকাশের লেনদেনের তথ্য, টাকা উত্তোলনের তথ্য, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর এবং মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য আদালতে দাখিল করেছেন বলে জানিয়েছেন কামরুজ্জামান।
ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু বলেন, ‘ফেসবুকে পরিচয়ের পর সাংবাদিক হিসেবে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার কথা বলে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চোখ ও হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং আমার ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সুযোগ পেয়ে আমি পালিয়ে জীবন রক্ষা করি।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আমি চাই, তদন্ত করে যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।’
মামলার তদন্তের পরই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে সাংবাদিককে অপহরণ করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলায় অপহরণ, জিম্মি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ব্যাংক ও বিকাশের লেনদেনের তথ্য, এটিএম বুথের অবস্থান, সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর এবং আইএমইআই নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হলে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।