সরকারের ঋণ বেড়েছে

সরকার
  © সংগৃহীত

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণগ্রহণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এ সময়ে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া মোট ঋণের প্রায় পুরোটা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সংগ্রহ করেছে। বিপরীতে জাতীয় সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ঋণ সংগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের প্রকাশিত ‘মাসিক প্রতিবেদন অন গভর্নমেন্ট ডোমেস্টিক বোরোয়িং-এপ্রিল ২০২৬’ অনুযায়ী, জুলাই-এপ্রিল সময়ে সরকারের মোট নিট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এটি পুরো অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যের ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

আগের অর্থবছরের একই সময়ে সরকারের নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ৮১ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এবং ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

জুলাই-এপ্রিল সময়ে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৪ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বাড়ায় ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অন্যদিকে একই সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ হয়েছে মাত্র ৭৬৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ৩১ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাত থেকে ঋণ সংগ্রহ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, জাতীয় সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ ঋণাত্মক হওয়ায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৭৫ হাজার ৮২০ কোটি টাকা, কিন্তু একই সময়ে মেয়াদপূর্তিসহ বিভিন্ন কারণে সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৭৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। ফলে নিট হিসাবে সরকারকে ৪২৯ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে নিট পরিশোধ ছিল ৭ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা।

শুধু এপ্রিল মাসের হিসাবেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এ মাসে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৫ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা ঋণ নিলেও পরিশোধ করেছে ৩০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। ফলে মাস শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের নিট পরিশোধ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকার ১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা নিট ঋণ সংগ্রহ করেছে।

প্রতিবেদনে শরিয়াহভিত্তিক সরকারি অর্থায়নের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ডের (বিজিআইআইবি) নিট স্থিতি জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৬ হাজার ৬১১ কোটি টাকা বেড়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুকের (বিজিআইএস) স্থিতি এপ্রিল শেষে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বাড়ার কারণে ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে জাতীয় সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ঋণের কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

এ বিষয়ে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ বলেন, বর্তমানে সরকারের নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়লে সুদ পরিশোধের চাপও বৃদ্ধি পাবে, যা বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় করতে হতে পারে।

তার মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কারণে ঋণ গ্রহণ অনেকাংশেই স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘমেয়াদে ঋণনির্ভরতা কমাতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানোর বিকল্প নেই।


মন্তব্য