খেলাপি ঋণে সব দেশকে ছাড়ালো বাংলাদেশ
- বাংলাকন্ঠ রিপোর্ট
- প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৩ PM , আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৩ PM
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই খেলাপি। এর ফলে খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্তে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানা।
এর আগে বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। তবে পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, আদায় ও পুনর্গঠন এবং তুলনামূলক ভালো মানের নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশটি খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। বিপরীতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা অনিয়মিত, সমস্যাগ্রস্ত ও বেনামি ঋণ নতুন করে চিহ্নিত হওয়ায় ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে।
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ ৩২.৭৮ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠেছিল।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বর্তমানে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, তার বড় অংশ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃ তফসিল, বিশেষ সুবিধা ও বিভিন্ন হিসাবগত কৌশলের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণকে নিয়মিত দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই এবং বিভিন্ন নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। ফলে আড়ালে থাকা অনেক ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
দেশের একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, ভুয়া ও বেনামি ঋণ, ব্যবসায় মন্দা এবং জ্বালানি সংকটও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
তালিকায় বাংলাদেশের পর চাদ
খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফাইন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটরসের সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। তবে চাদের এই তথ্য ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের। এরপর দেশটি আইএমএফের এই সূচকে নতুন তথ্য দেয়নি।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ। আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ।
চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে আলজেরিয়া। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা ঘানায় ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ।
ইউক্রেন কীভাবে খেলাপি ঋণ কমিয়েছে
একসময় খেলাপি ঋণের দিক থেকে শীর্ষে ছিল ইউক্রেন। রাশিয়ার হামলার পর দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগায় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠে যায়। ২০২৩ সালেও দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
তবে ২০২৪ সাল থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে। ঋণ আদায়, পুনর্গঠন এবং তুলনামূলক ভালো মানের নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ানোর পাশাপাশি কয়েকটি ব্যাংক পুরোনো খেলাপি ঋণ হিসাব থেকে অবলোপন করে। এর ফলে খেলাপি ঋণের অনুপাত দ্রুত কমে আসে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে ইউক্রেনের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বিপুল পরিমাণ পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন করে। এতে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর দেশটির খেলাপি ঋণের হার ২৩ দশমিক ৯১ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি তা কমে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশে।
তবে ঋণ অবলোপন মানেই ঋণ মাফ করে দেওয়া নয়। এসব ঋণের বিপরীতে আগে থেকেই শতভাগ সঞ্চিতি রাখা ছিল। অবলোপনের পর ঋণগুলো ব্যাংকের মূল হিসাবের বাইরে নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের কাছ থেকে পাওনা আদায়ের অধিকার ব্যাংকের রয়েছে।
ইউক্রেনে খেলাপি ঋণ কমার প্রবণতা এরপরও অব্যাহত রয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই খেলাপি ঋণের হার আরও কমে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে এটি দেশটির সর্বনিম্ন হার।
কেন শীর্ষে উঠে এল বাংলাদেশ
ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির পার্থক্য স্পষ্ট। ইউক্রেন পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, ঋণ পুনর্গঠন ও আদায়ের পাশাপাশি নতুন করে ভালো মানের ঋণ বিতরণ বাড়িয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে।
বাংলাদেশে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। মাত্র দুই বছরের মধ্যে তা বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
তবে এই বৃদ্ধির পুরোটা নতুন ঋণখেলাপির কারণে হয়েছে—এমন নয়। দীর্ঘদিন ধরে পুনঃ তফসিল, বিশেষ ছাড় ও বিভিন্ন হিসাবগত ব্যবস্থার মাধ্যমে আড়ালে থাকা বিপুল পরিমাণ সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে কী করা হচ্ছে
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের নিয়মে পরিবর্তন এনেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা, পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগে নিয়মিত হিসেবে দেখানো অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঋণ পুনঃ তফসিল বা অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার কমানো সম্ভব হলেও এতে ব্যাংকের প্রকৃত সমস্যা দূর হবে না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ এবং নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ সৃষ্টি ঠেকানো জরুরি।
তাদের মতে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণ অনুমোদন ও তদারকিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে কাগজে খেলাপি ঋণের হার কমলেও ব্যাংক খাতের আর্থিক সংকট থেকেই যাবে।