যন্তরমন্তর আসলে কী?

যন্তরমন্তর
  © সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের অনন্য নিদর্শন যন্তর মন্তর। বিশাল জ্যামিতিক কাঠামো এবং পাথরে নির্মিত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রসমৃদ্ধ এই স্থাপনাটি শুধু অষ্টাদশ শতকের জ্যোতির্বিদ্যার ঐতিহ্যের সাক্ষী নয়, সময়ের পরিক্রমায় এটি আধুনিক ভারতের নাগরিক আন্দোলনেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

১৭২৪ সালে জয়পুরের মহারাজা সওয়াই জয় সিং (দ্বিতীয়) দিল্লির যন্তর মন্তর নির্মাণ করেন। গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায় গভীর আগ্রহী এই শাসক নির্ভুল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে দিল্লির পাশাপাশি জয়পুর, উজ্জয়িনী, বারাণসী ও মথুরায় মোট পাঁচটি পর্যবেক্ষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভারতীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি ফার্সি, ইসলামি ও ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার সমন্বয়ে এসব স্থাপনার নকশা ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।

যন্তর মন্তরের বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো প্রচলিত স্থাপত্য নয়; বরং প্রতিটি কাঠামোই একটি করে বৈজ্ঞানিক যন্ত্র। এর মধ্যে সম্রাট যন্ত্র নামে পরিচিত বিশাল সৌরঘড়ি সূর্যের ছায়া পর্যবেক্ষণ করে স্থানীয় সময় অত্যন্ত নির্ভুলভাবে নির্ণয় করত। জয় প্রকাশ যন্ত্র মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান নির্ধারণে ব্যবহৃত হতো, আর বেলনাকার রাম যন্ত্র দিয়ে তারা ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর উচ্চতা এবং দিক পরিমাপ করা হতো।

আধুনিক টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগের যুগে এসব যন্ত্রের মাধ্যমে সময় নির্ধারণ, ক্যালেন্ডার প্রণয়ন, কৃষিকাজের পরিকল্পনা এবং নৌযাত্রার দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হতো। সে সময়ের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানচর্চায় যন্তর মন্তরের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির ভূমিকা বদলে যায়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরগুলোর কাছাকাছি এবং উন্মুক্ত স্থানে অবস্থিত হওয়ায় যন্তর মন্তর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সমাবেশ, প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। নানা দাবি-দাওয়া ও সামাজিক ইস্যুতে আন্দোলনকারীদের জন্য এটি আজ একটি সুপরিচিত সমাবেশস্থল।

প্রায় তিন শতক পেরিয়ে আজও যন্তর মন্তর ভারতের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য, স্থাপত্যশিল্প এবং পরিবর্তিত সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে। মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত এই স্থাপনাই সময়ের প্রবাহে নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের প্রতীকী মঞ্চে রূপ নিয়েছে।
সূত্র: ফার্স্ট পোস্ট


মন্তব্য