পুশইন ও সংখ্যালঘু নির্যাতন

আক্রমনাত্বক ভারত সংযত বাংলাদেশ

বিএসএফ
  © সংগৃহীত

ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকে দেশটির গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি কিংবা অন্যান্য অঞ্চলে মুসলমানদের ওপর হামলা, মসজিদ ঘিরে সংঘাত যেন নিত্যকার ইস্যু। দেশটির এমন সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডে ঘি ঢেলেছে সদ্যসমাপ্ত রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভূমিধ্বস বিজয়ের পর মুসলমানদের ওপর হামলা, মসজিদে নামাজ আদায়ে বাধা ও কোরবানি করতে না দেওয়াসহ সীমান্তে পুশইনের অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এতকিছুর পরও ভারতের আক্রমণাত্মক আচরণের বিপরীতে নজিরবিহীন সংযম ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করছে বাংলাদেশ। 

তবে ভারতের এমন খবরে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—"ওপারে মুসলমানদের ওপর হামলা হচ্ছে, কিন্তু এপারে কেন হিন্দুদের ওপর বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলা দেখা যায় না?"

রাজনৈতিক ও আবেগপ্রবণ হলেও এ প্রশ্নটির উত্তরে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এর আগে মাঝেমধ্যে কিছু হিন্দু পরিবারের ওপর বিচ্ছিন্ন সহিংসতা, মন্দিরে হামলা, জমি দখল বা ভয়ভীতির ঘটনা ঘটেছে। তবে ভারতের কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেশজুড়ে সংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশোধমূলক সহিংসতা বহুযুগ ধরেই বিরল বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, অনেকটা ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের সেই বিখ্যাত উক্তির মতোই ভারতের ‘অধম’ কর্মকাণ্ডের বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো ‘উত্তম’ আচরণই দেখিয়ে যাচ্ছে। সেটি যেমন সরকারি পর্যায়ে, তেমনি বেসরকারি অর্থাৎ সামাজিকভাবেও। 

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের কোনো আলোচিত সাম্প্রদায়িক ঘটনার পর বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ধর্মীয় সমাবেশ এবং স্পর্শকাতর এলাকাগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এখনো বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেদিকে কঠোর নজর রাখছে। যদিও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ অনেকটা গায়ে পড়ে বা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া লাগানোর মতো পরিস্থিতি উসকে দিচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত মূলত পুশইনের নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে সুযোগ নেওয়ার অপচেষ্টা করছে। দেশটি চায়, বাংলাদেশও তাদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে এমন কিছু করুক যাতে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করে। যদিও বাংলাদেশ সচেতনভাবে ভারতের সেই ষড়যন্ত্রে পা না দিয়ে অত্যন্ত সংযমের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। কারণ সম্প্রতি বাংলাদেশের ধর্মমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ বলেছেন, ‘এদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কোনো সুযোগ নেই। সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো ধরনের আক্রমণ বা ঘটনা ঘটলে যে কোনো মূল্যে তা সামাল দেওয়া হবে। যদি সামাল দিতে না পারি প্রয়োজনে পদত্যাগ করব। তবুও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে দেব না।’

জানা গেছে, ভারতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪-১৫% মুসলমান এবং বাংলাদেশে জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮% হিন্দু। সেজন্য দুই দেশে প্রায়ই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, বৈষম্য বা ধর্মীয় উত্তেজনার অভিযোগ ওঠে। তবে এসব ঘটনার ধরন, পরিসর ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। 

জানতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেসের সহকারী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের (বিডস) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান হোসাইন আনসারী বলেন, “ভারতে যে উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিকাশ হয়েছে বিজেপির দীর্ঘায়িত রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে, সেটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকেই যাচ্ছে। এই হিন্দুত্ববাদী আদর্শিক লক্ষ্যই হচ্ছে- ভারতীয় সেকুলারিজমকে নিঃশেষ করে আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশে-মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত একটি অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্যে ভারতের মানচিত্রে মুসলমানদের আত্মপরিচয়, তাদের চিহ্ন ও সংস্কৃতিকে ধুলিসাৎ করার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সীমান্তে ব্যাপকভিত্তিক পুশইন করা হচ্ছে।’

‘এ ছাড়া আরো যোগ হয়েছে চীন, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নয়ন। এটিকে বাধাগ্রস্ত করতে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে এক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়, যেন দেশটির কাছে নতজানু হয়ে সমঝোতায় বাধ্য হয় বাংলাদেশ”- যোগ করেন ড. ইমরান হোসাইন আনসারী। 

জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গত ১১ দিন ধরে বিএসএফের ক্রমাগত উসকানি ও পুশইনের মরিয়া চেষ্টা দুই দেশের সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। গত মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া এই উসকানি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহজুড়ে আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে গত শুক্রবার ভোররাতে বিএসএফ ১০ নারী, পুরুষ ও শিশুকে শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) ফেলে পুশইনের চেষ্টা করে। বিজিবির অনড় অবস্থান ও এলাকাবাসীর বাধার মুখে তারা প্রায় ৭০ ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে আটকে থাকার পর অবশেষে গভীর রাতে ফ্লাডলাইট বন্ধ করে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এরপর গত কয়েক দিনে ঝিনাইদহ, মেহেরপুর ও লালমনিরহাটের একাধিক পয়েন্টে বিজিবির কঠোর হুঁশিয়ারি ও জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ অবৈধভাবে নিয়ে আসা লোকজনকে প্রিজন ভ্যান বা গাড়িতে করে ভারতের ভেতরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বিএসএফ মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অজুহাতে বাংলাভাষী মানুষকে জড়ো করে রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক কাঁটাতারের গেট খুলে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সরকার ও বিজিবি বলছে, বিএসএফের আন্তর্জাতিক নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর অপতৎপরতা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হচ্ছে। প্রায় ১০ দিন ধরে ক্রমাগত উসকানি দিয়ে যাচ্ছে বিএসএফ। তবে এত সাড়া না দিয়ে চরম সহিষ্ণুতা দেখিয়ে যাচ্ছে বিজিবি। সীমান্তে অবৈধ ‘পুশইন’ বা জোর করে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো বা পুশব্যাকের নামে বিএসএফ দীর্ঘদিন ধরে নানা উৎপাত ও উত্তেজনা তৈরি করে আসছে। গত ৩১ মে থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিলেট, জামালপুর ও খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের পক্ষ থেকে রাতের আঁধারে কাঁটাতারের গেট খুলে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে। তবে বিজিবি এবং স্থানীয় জনসাধারণের অভূতপূর্ব যৌথ প্রতিরোধের মুখে ভারতের বিএসএফের সাম্প্রতিক ‘পুশইন’ চেষ্টাগুলো একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও সাধারণ মানুষ এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে ৭১টি সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, বাকিগুলোকে অপরাধমূলক বা অন্যান্য কারণে সংঘটিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও একই সময় সংখ্যালঘু সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের একটি অংশ দাবি করে যে প্রকৃত পরিস্থিতি সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক এবং অনেক ঘটনা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। 

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ সুকোমল বড়ুয়া বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ ভারতে সাম্প্রদায়িকতার ওপর বিবেচনা করে নানা ধরনের ঘটনা ঘটলেও ধর্মীয় সহিষ্ণুতায় বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল। কারণ এখানে সব ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষ একই সমাজে সুন্দরভাবে বসবাস করে আসছে। বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের যে সম্প্রীতি তা ভারতে বিরল। তিনি বলেন, ভারতে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব হলেও উদার গণতান্ত্রিক হওয়ায় বাংলাদেশে এসবের স্থান নেই এবং যেকোনো মূল্যে আমরা সেই সম্প্রীতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করি।’ 

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। যার বেশির ভাগ অঞ্চলই কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা। এই দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন স্থান দিয়ে বিভিন্ন সময় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সীমান্তে হত্যা এবং সাম্প্রতিক জোরপূর্বক পুশইনের ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সে দেশের কিছু মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ দাবি করে প্রতিদিনই সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা অব্যাহত রাখছে বিএসএফ। আইনের তোয়াক্কা না করে সীমান্তে বিএসএফের একতরফা এই পুশইনকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বিএসএফের এ অপতৎপরতাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির আলোকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ এবং সুস্পষ্ট ও উদ্বেগজনক কর্মকাণ্ড বলে অভিহিত করছেন।

মূলত সম্প্রতি ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপির বিপুল বিজয়ের পরই দেশটিতে মুসলামনদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরই এ মাত্রা চরম আকার ধারণ করে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথেই রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ওপর চরম নির্যাতন শুরু হয়। বিভিন্ন মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। সবশেষে কোরবানিও দিতে পারেনি মুসলমানরা। কারণ ‘গো-রক্ষা’র নামে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে গরু বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সেই সাথে গোটা পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ভারতীয়দের পুশইন করা শুরু করে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত জেলাগুলোতে গড়ে তোলা আটককেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৮০০ অবৈধ অভিবাসীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ ছাড়া আরো ৮৩৬ জন বর্তমানে ‘নিজ দেশে’ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। গত রবিবার বিজেপির একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রস্তুতি সভায় দেওয়া বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই তথ্য নিশ্চিত করেন। ইন্ডিয়া টুডের খবরে এ তথ্য জানা গেছে। যদিও বাংলাদেশের তরফ থেকে পুশইনের বিষয়টিকে বারবার দৃঢ়ভাবে নাকচ করা হয়েছে।

ওই অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারী জানান, রাজ্যের যে ৫৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় এখনো কোনো বেড়া নেই, তার মধ্যে প্রায় ১০০ কিলোমিটার অংশে বেড়া দেওয়ার জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সকে (বিএসএফ) ইতোমধ্যে জমি হস্তান্তর করেছে রাজ্য সরকার। তিনি উল্লেখ করেন, জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ অংশটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, বিজেপির এ ধরনের বক্তব্য ও নীতিমালা ভারতের ২০ কোটির বেশি মুসলমানের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের মতে, দলটি মূলত ধর্মীয় পরিচয়কে অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে একাকার করে দেখছে। পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও অভিযোগ, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারত সরকার শত শত বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে।

ভারতের এমন আচরণকে বাংলাদেশের জন্য ‘বিষফোঁড়া ও আগ্রাসী‘ উল্লেখ করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘ভারত গায়ে পড়ে বাংলাদেশের সাথে ঝগড়া করার পাঁয়তারা করছে। তারা সেখানে নিরীহ মুসলমানদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছে, যা অনেকটাই ফিলিস্তিনের মুসলমানদের মতো। ভারত যেন দিনে দিনে ইসরাইল হয়ে উঠছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে বলেই এদেশে এখনো হিন্দু-মুসলমান কেউ কারো প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণের চিন্তা করে না। তবে ভারতের এমন অমানবিক ও আগ্রাসী আচরণের সঠিক কূটনৈতিক জবাব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।’

সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ভারতীয় অংশে কাঁটাতারের লম্বা বেড়া দিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখলেও বাংলাদেশের দিকে এ ধরনের কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে প্রায়ই ভারতের সীমান্তরক্ষীরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে পুশইনের চেষ্টা করে। তবে বিজিবি দেশের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তে অভূতপূর্ব কড়া নজরদারি এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। চলমান সংকট মোকাবিলায় তারা টহল ব্যবস্থা এবং নজরদারিতে আধুনিক ও কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর বিএসএফের গুলি ও নির্যাতন বন্ধে ‘শূন্য সীমান্ত হত্যা’ নীতি বাস্তবায়নে চাপ দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জিরো লাইনের ১৫০ গজের ভেতর বিএসএফের কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের একতরফা চেষ্টা বন্ধের দাবি তোলা হচ্ছে। অস্ত্র, মাদক ও মানব পাচার রোধে দুই দেশের সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। 

বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাতের অন্ধকারে বিএসএফ যাতে লোক ঠেলে দিতে না পারে, সেজন্য কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, মেহেরপুর ও হিলি সীমান্তে থার্মাল ইমেজিং ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ওপারে বিএসএফের যেকোনো ধরনের গতিবিধি বা লোক জড়ো করার দৃশ্য কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেই শনাক্ত করা যাচ্ছে। সীমান্তের সংবেদনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোতে হাই-ডেফিনেশন নাইট ভিশন ক্যামেরা ও সিসিটিভি নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে, যা সরাসরি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর থেকে ২৪ ঘণ্টা মনিটর করা হচ্ছে। দেশের প্রায় ৭০টিরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ছুটি বাতিল করে সীমান্ত চৌকিগুলোতে (বিওপি) সদস্য সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে।

এদিকে বিজিবির চরম সহিষ্ণু ও দায়িত্বশীল নীতির বিষয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে তারা নানা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। একদিকে দেশের মানুষ বিজিবির দেশপ্রেম ও অনড় অবস্থানকে স্যালুট জানাচ্ছে, অন্যদিকে বিএসএফের ক্রমাগত উসকানির মুখে কেবল সহিষ্ণুতা দেখানোয় এক ধরনের ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ রাতের অন্ধকারে নারী ও শিশুদের জিরো লাইনে ফেলে রাখার মতো বিএসএফের অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। 

এদিকে পুশইনের নামে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এমন নজিরবিহীন মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার থেকে ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি এবং বিএসএফের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়েছে। চার দিনব্যাপী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি ভারতের নয়াদিল্লির সিজিও কমপ্লেক্সে অবস্থিত বিএসএফ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সীমান্তে সাম্প্রতিক চরম উত্তেজনা ও পুশইন চেষ্টার কারণে এবারের সম্মেলনটি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অবৈধভাবে পুশইন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সম্মেলনে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের এই অনৈতিক ও জোরপূর্বক পুশইন চেষ্টা এবং সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় কড়া প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।

বিজিবি সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম জানান, এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং পুশইন প্রতিরোধ। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও ঘটনার প্রমাণ ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বিএসএফের কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়েও বাংলাদেশের উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। সীমান্ত-সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার সমাধান হতে হবে আলোচনার মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। কোনো অবস্থাতেই একতরফাভাবে মানুষকে সীমান্তে এনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ নেই।’

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন বলেন, ‘বিএসএফের পুশইন বিষয়টি নতুন নয়। তবে এবারের মাত্রা অনেক বেশি এবং আক্রমণাত্মক। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুশইনের ধরনও পাল্টে গেছে।’ 

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি অসম্ভব ধৈর্য ও সহিষ্ণ‍ুতার পরিচয় দিচ্ছে। যেহেতু সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়েছে, আশা করি দুই দেশ একটি ইতিবাচক অবস্থানে যেতে সর্বোচ্চ ছাড় দেবে।


মন্তব্য