প্রথা ভাঙার কূটনৈতিক চাল
দিল্লির অস্বস্তিতেই মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
- মোহাম্মদ ঈমাম হাছান
- প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৪৩ PM , আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৯:১৫ PM
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে চিরচেনা ছক ভেঙে এক নতুন সমীকরণের সূচনা করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকার প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে বসা নতুন সরকার প্রধানদের প্রথম বিদেশ সফরের অবধারিত গন্তব্য যেখানে ছিল ভারত, অথবা ক্ষেত্রবিশেষে আমেরিকা বা চীন—সেখানে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কূটনৈতিক কৌশলের সাক্ষী হচ্ছে বিশ্ব। বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ টেবিলে থাকা সত্ত্বেও, ভারতকে কার্যত ‘কূটনৈতিক উপেক্ষা’র বার্তা দিয়ে, কুয়ালালামপুর হয়ে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ বিদেশ সফর নয়, বরং এটি দিল্লির আধিপত্যকামী একমুখী কূটনীতির বিরুদ্ধে ঢাকার এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক ডিটাচমেন্ট’ বা কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখার বার্তা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল রবিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দুই দেশীয় সফরকে ঘিরে দক্ষিণ এশীয় কূটনৈতিক মহলে রীতিমতো তোলপাড় চলছে। বিশেষ করে সাউথ ব্লকের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হয়েছে যখন জানা গেছে, বেইজিংয়ের মাটিতে পা রাখার আগে ট্রানজিট বা প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়াকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ২৩ থেকে ২৬ জুন চীনের বেইজিংয়ে অবস্থান করার আগে আগামীকাল বিকালে তিনি মালয়েশিয়ায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সারবেন।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজিং যাওয়ার পথে মালয়েশিয়াকে যুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই বার্তাই স্পষ্ট করেছে যে, ঢাকা তার পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো একক আঞ্চলিক পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারতের ইন্ধনে বা প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলবে না—এই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিই এখন ঢাকার মূল চালিকাশক্তি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “তারেক রহমানের এই ‘দিল্লিকে এড়িয়ে যাওয়ার’ নীতি সাউথ ব্লকের জন্য একটি বড় ধাক্কা। বিশেষ করে গত দেড় দশকে ঢাকা-দিল্লি যে নিবিড় অক্ষ তৈরি হয়েছিল, তা এক ঝটকায় ফিকে হতে শুরু করেছে।”
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর এই বেইজিং সফরে শুধু যে রাজনৈতিক প্রতীকী বার্তা রয়েছে তা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক বিশাল অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা।
অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবকাঠামো তহবিল ও বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়টি হলো বহুল আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বা তিস্তা প্রজেক্ট।
কয়েক দশক ধরে ভারতের কাছ থেকে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না পেয়ে ধুঁকছে বাংলাদেশের উত্তরদঞ্চল। বিগত সরকার ভারতের আশ্বাসে বছরের পর বছর এই প্রকল্প ঝুলিয়ে রাখলেও বর্তমান সরকার বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের প্রস্তাবিত তিস্তা ব্যারেজ ও তীর ব্যবস্থাপনা প্রকল্পকে এবার চূড়ান্ত রূপ দিতে যাচ্ছে। বেইজিং সফরকালে দুই দেশের মধ্যে অন্তত ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হওয়ার কথা রয়েছে, যার মধ্যে তিস্তা প্রকল্প অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। ঢাকার এই পদক্ষেপ ভারতের জন্য কৌশলগত মাথাব্যথার কারণ, কারণ শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর এত কাছাকাছি চীনের এই বিশাল অর্থনৈতিক ও কারিগরি উপস্থিতি দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ৬ দিনের এই ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সফরের মধ্যে তিনি প্রথম ২ দিন কাটাবেন মালয়েশিয়ায় এবং শেষ ৪ দিন কাটাবেন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি চীনে। প্রতিবেশী ভারতকে দৃশ্যত ‘ডিঙিয়ে’ দূরপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে ঢাকার এই প্রথম পা বাড়ানোকে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে একটি বিশাল ভূ-রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। এই সফর শুধু প্রথা ভাঙার গল্প নয়, এর পেছনে রয়েছে ঢাকার নতুন কৌশলগত অবস্থান, গভীর অর্থনৈতিক হিসাব, সামরিক আধুনিকায়ন এবং দিল্লির সঙ্গে তৈরি হওয়া এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার সাথে মূলত অর্থনৈতিক, রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল রাখা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক চুক্তিগুলোতে জোর দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে জি-টু-জি প্লাস শ্রমবাজার চুক্তি সংশোধন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমানো, থার্ড পার্টি সিন্ডিকেট নির্মূল এবং বন্ধ থাকা শ্রমবাজার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে একটি বিশেষ চুক্তি সই হবে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের লক্ষে যৌথ ঘোষণা ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হবে।
সূত্র জানায়, সফরের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন অংশে প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এখানে সামরিক ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় চূড়ান্ত হতে পারে। এরমধ্যে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ রয়েছে, তা এই সফরে আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের চুক্তিতে রূপ নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চীন থেকে শুধু সামরিক হার্ডওয়্যার কেনা নয়, বরং বাংলাদেশের ডিফেন্স ফ্যাক্টরিগুলোতে যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ তৈরির প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য একটি বড় চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া নৌ ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, সাবমেরিন রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা (কক্সবাজারের সাবমেরিন ঘাঁটির কারিগরি উন্নয়ন) এবং বিমানবাহিনীর জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান ও রাডার সিস্টেম ক্রয়ের চুক্তি চূড়ান্ত হবে। এজন্য দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে যৌথ মহড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সাইবার নিরাপত্তা সুরক্ষায় বিশেষ কৌশলগত চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে চীনের সাথে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে এবার ঢাকা অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়ে টেবিল বৈঠক করতে যাচ্ছে। চীন ইতিমধ্যেই বাংলাদেশকে ৯৮% পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এবার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তৈরি পোশাক (RMG), চামড়াজাত পণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ১০০% শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের আনুষ্ঠানিক চুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিস্টোরেশন প্রজেক্ট (তিস্তা মহাপরিকল্পনা)-এ চীনের সরাসরি আর্থিক ঋণ এবং কারিগরি সহায়তার চুক্তি এই সফরের প্রধান আকর্ষণ। এছাড়াও ডলার সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নিজস্ব মুদ্রা (টাকা ও ইউয়ান) দিয়ে সরাসরি আমদানির বিল মেটানোর জন্য একটি বড় আর্থিক চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে যাকে কারেন্সি সোয়াপ নামে অভিহিত করা হচ্ছে।
অপরদিকে তারেক রহমানের এই সফরে ভারতকে সম্পূর্ণ ‘উপেক্ষা’ করার নীতি দিল্লির আঞ্চলিক কূটনীতির জন্য একটি বড় পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের বহুল প্রচারিত ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ (প্রতিবেশী প্রথম) নীতি যে মালদ্বীপ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার পর এবার বাংলাদেশেও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে, তা স্পষ্ট।
দিল্লির গণমাধ্যমগুলোতে ইতিমধ্যেই এই সফর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ যদি সম্পূর্ণভাবে চীনের অর্থনৈতিক বলয়ে চলে যায়, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা এবং ট্রানজিট সুবিধা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। এতদিন বিনা শুল্কে ও নামমাত্র মূল্যে বাংলাদেশের বুক চিরে যে ট্রানজিট সুবিধা ভারত ভোগ করে আসছিল, নতুন সরকারের ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষা’র অনমনীয় মনোভাবের কারণে তা পুনর্বিবেচনার মুখে পড়তে পারে। ভারতের সাউথ ব্লক এখন হন্যে হয়ে চেষ্টা করছে কীভাবে ঢাকার এই চীনমুখী যাত্রায় একটি ‘স্পিড ব্রেকার’ বসানো যায়। আর এই কারণেই দেশের ভেতরের উগ্র উপাদানগুলোকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির পথ বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন এ দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, যারা বিগত দিনের ভূরাজনৈতিক খেলাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
কী বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এই সফরকে ঢাকার একটি 'কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য' হিসেবে দেখছেন। তিনি বাংলাকন্ঠকে বলেন, “তারেক রহমানের এই সফরটি প্রথাগত কূটনৈতিক ধারার বাইরে একটি বড় ধাক্কা। তবে এটিকে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশ এখন নিজের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে। মালয়েশিয়ায় আমাদের বিশাল শ্রমবাজারের সংকট সমাধান এবং চীনের কাছ থেকে তিস্তা প্রকল্পের মতো বড় অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে ঢাকার প্রধান অগ্রাধিকার। ভারত অবশ্যই এতে কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক চাপে পড়বে, তবে ঢাকাকে মনে রাখতে হবে যে ভারতের সাথেও আমাদের একটি বিশাল সীমান্ত ও বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। তাই এই সফরের পর দিল্লির সাথে দ্রুত একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংলাপে বসা জরুরি।”
বাণিজ্যের বিষয়টি ইতিবাচক দেখলেও সামরিক চুক্তিতে সতর্কতার পরামর্শ দিয়ে কথা বলেছেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, "চীনের সাথে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি আমাদের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য লাইফলাইন হতে পারে। তবে বেইজিংয়ের সাথে নতুন কোনো বড় সামরিক চুক্তি করার ক্ষেত্রে ঢাকাকে অত্যন্ত বিচক্ষণ হতে হবে। প্রথম সফরেই চীনের সাথে বড় সামরিক চুক্তি দিল্লির সাউথ ব্লকে বড় ধরনের অ্যালার্ম বাজিয়ে দেবে।
তবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করে রাম মন্দির ইস্যুর মতো স্পর্শকাতর বিষয় সামনে আনার যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক মন্তব্য করে সাবেক এ পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “যদি এমন কোনো অপচেষ্টা হয়ে থাকে, তবে তা হবে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনকে এই বিষয়ে চরম সতর্ক থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই দেশের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হতে দেওয়া যাবে না।”
অপরদিকে নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ মনে করেন, সামরিক চুক্তিটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জরুরি এবং এটি ঢাকার দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াবে। তিনি বলেন, “প্রতিরক্ষা খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদনের চুক্তি বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বাংলাদেশ কোনো দেশের সাথে যুদ্ধ চায় না, কিন্তু নিজের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিকায়ন করার সার্বভৌম অধিকার ঢাকার রয়েছে। চীন আমাদের তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়ন করছে এবং সামরিক প্রযুক্তি দিচ্ছে—এটি আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে।
এর ফলে ভারতের পক্ষ থেকে যে ভূ-রাজনৈতিক চাপ বা গোয়েন্দা তৎপরতা আসতে পারে, তা মোকাবেলায় দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। এই পূর্বমুখী নীতি আলটিমেটালি ভারতের সাথে আমাদের দরকষাকষির ক্ষমতা (Bargaining Power) বাড়াবে।"
কিন্তু এতসব সমীকরণ ছাড়িয়ে ভারত-বাংলাদেশের সর্ম্পকের বিষয়টি নিয়ে চাপা আলোচনা-সমালোচনার গুঞ্জন শোনা গেছে সেগুনবাগিচায়। কেউ কেউ বলছেন, এই সফরের পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে কি স্থায়ী ফাটল ধরবে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, কূটনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু নেই, আসল হলো 'জাতীয় স্বার্থ'। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা বেষ্টিত। ফলে ভারতকে পুরোপুরি মাইনাস করে বা শত্রুতামূলক অবস্থানে রেখে বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে চলা কঠিন। ভারতও ভালো করে জানে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা ও ট্রানজিটের জন্য ঢাকার সহযোগিতা তাদের কতটা জরুরি।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, তারেক রহমানের এই কুয়ালালামপুর ও বেইজিং সফর ভারতকে ছিটকে দেওয়ার পদক্ষেপ নয়, বরং ভারতকে এই বার্তা দেওয়া যে—"বাংলাদেশ আর আগের মতো একমুখী বা নতজানু কূটনীতিতে বিশ্বাসী নয়।" ঢাকা এখন দিল্লির সমকক্ষ অংশীদার হিসেবে টেবিলে বসতে চায়, কোনো মক্কেল রাষ্ট্র হিসেবে নয়। চীন থেকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বড় সুবিধা নিয়ে আসার পর, বাংলাদেশ যখন পরবর্তী সময়ে দিল্লির সাথে আলোচনায় বসবে, তখন ঢাকার দরকষাকষির শক্তি অনেক বেশি থাকবে।
তারেক রহমানের এই ‘চীন-মালয়েশিয়া অক্ষ’ ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক রহস্যময় অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের দাবি, বাংলাদেশ সরকার যখন দিল্লির প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই দেশের ভেতরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার এক গভীর ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের বহুল আলোচিত ‘রামমন্দির ইস্যু’কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশকে উস্কে দিয়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে তথ্য মিলেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্র উস্কানিমূলক প্রচারণা এবং রামমন্দির প্রতিষ্ঠার উৎসবের আদলে এক ধরনের রাজনৈতিক শো-ডাউন করার চেষ্টা চলছে।
ঢাকার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি আসলে দিল্লির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি সুদূরপ্রসারী ‘প্রক্সি স্ট্র্যাটেজি’। বাংলাদেশে একটি কৃত্রিম সংখ্যালঘু নির্যাতন বা সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতার বয়ান তৈরি করতে পারলে বিশ্বমঞ্চে ঢাকাকে কোণঠাসা করা সহজ হবে এবং নতুন সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা যাবে, যা প্রকারান্তরে তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সাফল্যকে ম্লান করে দিতে পারে।
তারেক রহমানের এই সফর বেইজিংয়ের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং এটি ভারতের প্রতি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা যে, “বাংলাদেশকে আর কোনো দেশের ‘আজ্ঞাবহ’ বা ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ ভাবার দিন শেষ”। বাংলাদেশ তার নিজের ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে। মালয়েশিয়ার মতো একটি ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম প্রধান দেশকে প্রথম গন্তব্য করা এবং এরপর চীনের মতো অর্থনৈতিক পরাশক্তির সঙ্গে বড় চুক্তি করা—ঢাকার এই আত্মবিশ্বাস সাউথ ব্লককে যেমন ভাবাচ্ছে, তেমনি দেশের ভেতরের সার্বভৌমত্বকামী মানুষকে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।