নজরুলের এমপি পদ নিয়ে যত কথা
- বাংলাকণ্ঠ ডেস্ক
- প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৮ PM , আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৮ PM
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, তাঁকে ঘিরে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। পরে দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক তদন্তের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এমপি পদ থাকবে কি?
দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না এ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, সংগঠনের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন বা নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করলে সদস্যপদ বাতিল কিংবা বহিষ্কারের বিধান রয়েছে। সদস্যপদ বাতিল ও বহিষ্কার দুটি ভিন্ন বিষয়। বহিষ্কার হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংগঠনের সঙ্গে আর যুক্ত থাকতে পারেন না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক ও সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, দল থেকে বহিষ্কার হলেও গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না। তিনি বলেন, নৈতিক স্খলনের অভিযোগ সংসদীয় তদন্তে প্রমাণিত হলে তবেই এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের প্রশ্ন আসতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকও একই ধরনের মত দেন। তাঁর ভাষ্য, সংবিধান অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য দলের বিপক্ষে ভোট দিলে, দল থেকে পদত্যাগ করলে বা নৈতিক স্খলনসংক্রান্ত অপরাধে ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড পেলে সদস্যপদ হারাতে পারেন। তবে ‘নৈতিক স্খলন’ বলতে ঠিক কোন অপরাধ বোঝায়, সে বিষয়ে সংবিধানে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নেই এবং আদালতের রায়েও বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের মত ভিন্ন। তিনি বলেন, নৈতিক স্খলনের কারণে দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনায় সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হতে পারে এবং এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তিনি ১৯৯৬ সালের সংসদের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের উদাহরণ টেনে বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের পর আদালতে গিয়েও তিনি সংসদ সদস্য পদ ধরে রাখতে পারেননি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মত দেন যে, নৈতিক স্খলনের কারণে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার সুযোগ নেই।
তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দল থেকে পদত্যাগ, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বা ভোটদানে বিরত থাকার মতো পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কারকে সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
তিনি বলেন, তাই শুধুমাত্র দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এমনটি সংবিধানের ভাষা থেকে বলা যায় না। তবে পরবর্তী সময়ে অনুচ্ছেদ ৭০-এ বর্ণিত অন্য কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্যের যোগ্যতা বা সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।
তবে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আদালতে বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চাইলে হাইকোর্টে রিট করতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে পরে আপিল বিভাগেও যেতে পারবেন।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বিষয়টি তিনি গণমাধ্যম থেকে জেনেছেন। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন। তবে গাজী নজরুল ইসলাম যদি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেন, সে ক্ষেত্রে সংসদীয় আসন শূন্য হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কিংবা দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি।