নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষেই অনিরাপদ নারী
- বাংলাকন্ঠ রিপোর্ট
- প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৬ PM , আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৬ PM
দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাবেক এক নারী সহকর্মীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একটি ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ওই নারীর শারীরিক গঠন, ব্যক্তিগত ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে আপত্তিকর আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে তাকে নিয়ে যৌন হয়রানিমূলক বিভিন্ন রসিকতাও করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফারিয়া আজাদের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ফারিয়া আজাদ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে দীর্ঘদিন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি সুইডেনে টক্সিকোলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।
বিদেশে অবস্থানকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা বিভিন্ন ছবি ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সাবেক কর্মস্থলের কয়েকজন সহকর্মী আপত্তিকর আলোচনা করতেন বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফারিয়া আজাদ। এ উদ্দেশ্যে ‘সংগ্রাম সৈনিকদের সঞ্চয়’ নামে একটি ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি তার।
ফারিয়া আজাদের অভিযোগ, ওই গ্রুপে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। তাদের কেউ কেউ তার শারীরিক গঠন, ব্যক্তিগত জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে কুরুচিপূর্ণ এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।
কথোপকথনের কিছু স্ক্রিনশট পরে ফারিয়া আজাদের হাতে পৌঁছায়। সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে নিজের ক্ষোভ ও বিস্ময়ের কথা জানান তিনি।
ফেসবুক পোস্টে ফারিয়া আজাদ বলেন, চার বছর আগে যে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এসেছেন, সেখানকার সাবেক সহকর্মীদের কেউ তাকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন—বিষয়টি তার কাছে অবিশ্বাস্য। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা এবং সহকর্মীদের মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তারা হলেন রাজশাহী জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার চিন্ময় প্রামাণিক, সিলেট জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার সৈয়দ সারফরাজ হোসেন, জামালপুর জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার আবু নাসের মোহাম্মদ শফিউল্লাহ, রংপুরের নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. লোকমান হোসেন, মৌলভীবাজার জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. শাকিব হোসাইন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাকিল আহম্মেদ।
ফারিয়া আজাদের দাবি, তালিকায় থাকা কয়েকজন বর্তমানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে কর্মরত। অন্যরা প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে বর্তমানে ভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন।
ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের কাছে ই-মেইলে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ফারিয়া আজাদ। এতে তিনি ঘটনার প্রতিকার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি অভিযোগটি পেয়েছেন এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান চেয়ারম্যান।
এদিকে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে ‘নারী হয়রানি প্রতিরোধ সেল’ গঠনের আবেদন জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে কর্মক্ষেত্রে কোনো নারী হয়রানি, অশালীন আচরণ, অপব্যবহার বা বৈষম্যের শিকার হলে যাতে সহজে অভিযোগ জানাতে ও প্রতিকার পেতে পারেন, সেজন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিশ্চিত হওয়ার পর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীর শারীরিক গঠন, ব্যক্তিগত জীবন বা দাম্পত্য বিষয় নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ও কুরুচিপূর্ণ আলোচনা অনৈতিক আচরণের পাশাপাশি সরকারি চাকরির আচরণবিধির লঙ্ঘনও হতে পারে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা রয়েছে। রিট পিটিশন নং ৫৯৩৯/২০০৮-এর প্রেক্ষাপটে দেওয়া নির্দেশনায় কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি মৌখিক, আচরণগত ও মানসিক হয়রানির বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
অভিযোগে নাম আসা একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি। তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে অভিযোগের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়। ঘটনাটি এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে- দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিজেদের আচরণ ও নৈতিকতার মানদণ্ড কতটা উচ্চ হওয়া উচিত।