পে স্কেল

উপরে আনন্দ, ভেতরে অর্থের জোগান নিয়ে প্রশ্ন

বেতন কাঠামো
  © সংগৃহীত

বেতন-ভাতা ও পেনশনের হার বাড়িয়ে বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলিও অনুমোদন করা হয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো পরে অনুমোদন করা হবে। নতুন কাঠামোর সব সুবিধা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে।

সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এতে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে পুরো কাঠামো একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে দুই অর্থবছরে তিন ধাপে কার্যকর করা হবে।

বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। পরে তথ্য অধিদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।

জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সুপারিশ প্রণয়নে একটি সচিব কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই মন্ত্রিসভা নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে।

সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় নিয়ে এ কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। একসঙ্গে পুরো বেতনকাঠামো কার্যকর করলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে—এ কারণে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নতুন কাঠামোতেও ২০টি গ্রেড থাকছে। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হবে ২০ হাজার টাকা। আর ১ম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে আরও ৩০ শতাংশ এবং একই বছরের জুলাইয়ে বাকি ৩০ শতাংশ কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। অবসরভোগীদের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।

নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে এ অনুপাত ১:১.৯৪৫ থাকলেও নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।

কম পেনশনভোগীদের বাড়তি সুবিধা

নতুন বেতনকাঠামোয় পেনশনভোগীদের জন্যও উল্লেখযোগ্য সুবিধা রাখা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ চালুর প্রতিশ্রুতি থাকলেও এটি পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পেনশনভোগীদের পেনশনের হার বাড়ানো হচ্ছে।

  • ৯ হাজার টাকা বা কম পেনশন হলে বাড়বে ১০০ শতাংশ

  • ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৭৫ শতাংশ

  • ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬৫ শতাংশ

  • ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬০ শতাংশ

  • ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি হলে বাড়বে ৫৫ শতাংশ

চালু হচ্ছে প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা

সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু করা হচ্ছে। প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে।

এ ছাড়া সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতদিন পঞ্চম গ্রেড ও তার ওপরের গ্রেডের কর্মচারীরা এ সুবিধা পেতেন।

সরকারের হিসাবে, নতুন বেতনকাঠামোর ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী উপকৃত হবেন। এর সঙ্গে প্রায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী যুক্ত হবেন। সব মিলিয়ে সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ।

নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোয় এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।

বিচার বিভাগের জন্য আলাদা কাঠামো

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতনকাঠামো অনুমোদন করা হবে। এটিও ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাড়তি অর্থের জোগান নিয়ে প্রশ্ন

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে। এ অর্থের জোগান দিতে রাজস্ব আয় বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমানে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই।

গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ যাতে কমে না যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। একই সঙ্গে অর্থের জোগান দিতে অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর পথ এড়িয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানো প্রয়োজন।

বেসরকারি খাতেও বর্তমানে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কম। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ফলে সরকারি বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।


মন্তব্য