বিরোধীদলের তীব্র আপত্তির মুখেও সংসদে যে বিল পাস

সংসদ
  © সংগৃহীত

বিরোধী দলের নানা আপত্তি ও সমালোচনার মধ্যেই বহুল আলোচিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে আইনে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কণ্ঠভোটে বিলটি পাসের জন্য দেন। পরে তা পাস হয়।

এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। বুধবার কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করা হলে বিলটির বিভিন্ন ধারার বিষয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সাতটি নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানানো হয়।

এরপর সংসদীয় কমিটির সুপারিশসহ বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় বিরোধী দলীয় নেতাসহ অন্যান্য বিরোধী সদস্যরা বিলটির তীব্র বিরোধিতা করেন।

বিরোধী দলীয় নেতা তার বক্তব্যে বলেন, র‌্যাব বিলুপ্ত করে শুধু নতুন নামে একই ধরনের বাহিনী গঠন করলে জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। এ কারণে কোনো অবস্থাতেই আইনটি পাস করা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে বিরোধী দলের আপত্তি ও সমালোচনার মধ্যেই কণ্ঠভোটে বিলটি পাস করে জাতীয় সংসদ।

বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের আপত্তিতে উল্লেখ করেন যে, র‌্যাব বিলুপ্তির পর পর্যাপ্ত জাতীয় পরামর্শ এবং শক্তিশালী ও স্বাধীন জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে এসআরবি শেষ পর্যন্ত র‌্যাবেরই নতুন রূপ ধারণ করতে পারে। এজন্য তারা রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার দাবি জানান। বিশেষ করে র‌্যাবের পুরোনো নথি, গুমের আলামত ও রেকর্ডপত্র সরাসরি স্থানান্তরের আগে আলাদা তালিকা তৈরি ও সংরক্ষণের দাবি তোলা হয়, যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট বা পরিবর্তন না হতে পারে।

পাস হওয়া আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের অধীন এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে, যার সদর দপ্তর স্থাপন করা হবে ঢাকায়। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এটি গঠন করা হবে। এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মহাপরিচালক, যিনি পুলিশ বাহিনীর অন্তত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা হবেন। তিনি বাহিনীর প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা পরিচালনা করবেন।

আইনের ১০ ও ১২ ধারায় এসআরবির মূল দায়িত্ব ও ক্ষমতার পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ, গুম, ভূঁইফোড় ভূমিদস্যুতা, মানবপাচার, গুম ও মাদক দমনে বাহিনীটি কাজ করবে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারি, তল্লাশি ও আলামত জব্দের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত এসআরবির কাছে নিজস্ব হেফাজতে রাখা যাবে না, বরং আইন অনুযায়ী অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। বাহিনীর সাব-ইন্সপেক্টর বা তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আদালত, সরকার বা পুলিশ প্রধানের নির্দেশনায় এসব অপরাধের আনুষ্ঠানিক তদন্ত পরিচালনা করতে পারবেন।

বিলে বাহিনীর সদস্যদের জন্য কঠোর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা, মদ্যপ অবস্থা, বেআইনি দখলদারি, হেফাজতে থাকা ব্যক্তির প্রতি নির্যাতন বা বল প্রয়োগ, প্ররোচনা দেওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ অমান্য করাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। প্রমাণ সাপেক্ষে বরখাস্ত, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর বা বেতন-ভাতা বাজয়াপ্তের পাশাপাশি তিরস্কার ও জরিমানা মতো শাস্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা ব্যক্তিগত অভিযোগ বা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ নিরসনে একটি বিশেষ ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠিত হবে।

আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিলে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পরিবর্তিত সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে অপরাধের বৈচিত্র্যময় রূপ এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এমন আধুনিক ও দক্ষ বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। র‌্যাব বিলুপ্তির মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিমূলক আধুনিক বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে এসআরবিকে তৈরি করা হয়েছে। আইনটি দ্রুত কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাব সংক্রান্ত আগের সব বিধান বাতিল বলে গণ্য হবে এবং বিলুপ্ত র‌্যাবের সমস্ত সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, তহবিল ও নথি এসআরবিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যস্ত হবে।

 


মন্তব্য