খালেদা জিয়া: আপোসহীনতায় বিলিয়েছেন জীবন
- কাজী শাহজাহান
- প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৭ PM , আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২০ PM
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় নাম। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনায়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেননি, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত করেন। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে তৎকালীন ভারতের জলপাইগুড়িতে তাঁর জন্ম। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন সমাজকর্মী। দেশভাগের পর পরিবার দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানেই তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কাটে। দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৬৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাঁদের দুই ছেলে—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। জিয়াউর রহমানের কর্মসূত্রে জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং একপর্যায়ে পাকিস্তানেও বসবাস করতে হয়। সে সময় তাঁর জীবনের মূল ব্যস্ততা ছিল পরিবার ও সন্তানদের দেখাশোনা। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও তখন পর্যন্ত সক্রিয় রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার সরাসরি উপস্থিতি ছিল না।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনে এক গভীর ও সংকটময় অধ্যায়। স্বাধীনতার সংগ্রামের শুরুতে জিয়াউর রহমান যুদ্ধে যোগ দিলে দুই সন্তানকে নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামে অবস্থান করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকায় তাঁকে আত্মগোপনে থাকতে হয়। পরে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকায় এসে স্বজন ও পরিচিতদের বাসায় আশ্রয় নেন। ২ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাসা থেকে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে দুই সন্তানসহ আটক করে। পরে তাঁদের ঢাকা সেনানিবাসের একটি বাড়িতে রাখা হয়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তিনি বন্দি ছিলেন।
স্বাধীনতার পরও বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল মূলত পারিবারিক পরিসরকেন্দ্রিক। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের আহ্বানে তিনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। রাজপথের আন্দোলন, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক চাপ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়। এ সময়ই তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন।
জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর বেগম খালেদা জিয়া দলটিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সরকারের সময় সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনীতি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিনি আরও দুইবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ের পর তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতায় থাকা যেমন ছিল, তেমনি বিরোধী দলেও থেকে তাঁকে আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নানা সংকট, মামলা, গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব ধরে রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে দলটি বারবার সংকট কাটিয়ে সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব শুধু একটি দলের নেত্রী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তিনি দেশের দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকারও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘদিন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বিএনপির নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আসেন। নানা প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি দলকে সংগঠিত রাখার চেষ্টা করেন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাই শুধু তাঁর অর্জিত ক্ষমতা বা পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বিএনপির সাংগঠনিক বিকাশ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর জীবনের উত্থান-পতন, সংগ্রাম, সাফল্য ও বিতর্ক সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি প্রভাবশালী চরিত্র।
জীবনের শেষ অধ্যায়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর উপস্থিতি ও প্রভাব অটুট ছিল। তাঁর মৃত্যুর পরও দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর দৃঢ় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান এবং দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায়।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন তাই বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ পরিবর্তনশীল সময়ের প্রতিচ্ছবি। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার এই যাত্রা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে জায়গা করে দিয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।জিয়াউর রহমানের মৃত্যু
স্বামী জিয়াউর রহমানের প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার ছিল গভীর ভালোবাসা ও নির্ভরতার সম্পর্ক। স্বামী বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তিনি অনেক রাত জেগে অপেক্ষা করতেন। এ সময় বই ও পত্রপত্রিকাই ছিল তাঁর সঙ্গী। জিয়াউর রহমান বাড়ি ফিরলে দুজন একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যেতেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে স্ত্রীকে ফোন করেন জিয়াউর রহমান। তিনি জানান, পরদিন বাড়ি ফিরবেন এবং চট্টগ্রামে ভালো আছেন। সেটিই ছিল খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ ফোনালাপ। ওই রাতেই একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হামলায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাঁদের দীর্ঘ ২১ বছরের দাম্পত্য জীবন।
পরদিন সকালে স্বামীর মৃত্যুসংবাদ জানতে পেরে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে জিয়াউর রহমানের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। স্বামীর মৃত্যুর কয়েক দিন পর, ৩ জুন তাঁর কবরে যান খালেদা জিয়া। সেই দৃশ্য উপস্থিত মানুষের মধ্যে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে।
স্বামীর মৃত্যুর পরও তখন পর্যন্ত রাজনীতিতে প্রবেশের কোনো পরিকল্পনা ছিল না খালেদা জিয়ার। তিনি ছিলেন মূলত একজন গৃহবধূ, দুই সন্তানের মা। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত তাঁকে ভিন্ন এক পথে নিয়ে যায়।
রাজনীতিতে অভিষেক
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এবং রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে অপসারণ করেন।
এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর বিএনপির ভেতরেও দেখা দেয় বিভাজন ও নেতৃত্বের সংকট। দলের অনেক নেতা এরশাদ সরকারের সঙ্গে যোগ দেন। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে দলের নেতারা খালেদা জিয়াকে সক্রিয় রাজনীতিতে আসার আহ্বান জানান।
১৯৮২ সালে তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। ১৯৮৩ সালে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব
বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে আরও জোরালো করেন। আন্দোলনের সময় তাঁকে একাধিকবার আটক করা হয়। রাজপথের আন্দোলনে প্রাণহানি ও দমন-পীড়নের মধ্যেও বিএনপির নেতৃত্বে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিভিন্ন ছাত্র সংসদে সাফল্যও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে। ধীরে ধীরে এরশাদবিরোধী আন্দোলন দেশজুড়ে গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতন ঘটে। দীর্ঘ আন্দোলনে দৃঢ় অবস্থানের কারণে খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেয়।
প্রথম নির্বাচনী সাফল্য
এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই বিজয়ী হন। ওই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।
১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায় বাংলাদেশ।
প্রথম মেয়াদ: ১৯৯১-১৯৯৫
প্রথম মেয়াদে খালেদা জিয়া সরকারের অন্যতম বড় রাজনৈতিক অর্জন ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। একই সময়ে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, রপ্তানিমুখী শিল্প ও নারী কর্মসংস্থানে বিভিন্ন পরিবর্তন আসে। তৈরি পোশাকশিল্পের সম্প্রসারণের ফলে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমবাজারে যুক্ত হন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থ তুলে ধরেন। গঙ্গার পানিবণ্টন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আনেন। ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা হয়।
দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। তবে ওই নির্বাচন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র আপত্তি ছিল। আন্দোলন, হরতাল ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সরকার দ্রুত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়।
ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করার জন্য সংশোধনী পাস হয়। এরপর খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের সূচনা করে।
তৃতীয়বার নির্বাচনে অংশগ্রহণ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও ১১৬টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। খালেদা জিয়াও পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন জোরদার করতে বিএনপি বিভিন্ন দলকে নিয়ে জোট গঠনের উদ্যোগ নেয়।
চারদলীয় জোট
১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচনী প্রস্তুতিতে এই জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খালেদা জিয়া জোটটির প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন।
২০০১ সালের নির্বাচন ও তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এর ফলে খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতে বিজয়ী হন।
২০০১-২০০৫ মেয়াদের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ
তৃতীয় মেয়াদে তাঁর সরকার নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সংস্কারে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষায় সহায়তা, নারী শিক্ষার বিস্তার এবং সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে নকল প্রতিরোধ এবং পরীক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও তাঁর সরকারের অন্যতম আলোচিত কর্মকাণ্ড ছিল। নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় তাঁর নাম স্থান পায়।
সব মিলিয়ে, একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার পথটি ছিল বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলোর একটি। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় তৈরি করেন।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আলোচিত এক-এগারো
২০০৬ সালের নভেম্বরে সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ওই সরকার ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেয় এবং মনোনয়নপত্র জমা দেয়। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। স্থগিত করা হয় ২২ জানুয়ারির নির্বাচন।
গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক সংকট
ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। একই সঙ্গে বিএনপিকে দুর্বল ও বিভক্ত করার নানা উদ্যোগের অভিযোগ ওঠে। দলের তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে ঘিরে নেতৃত্বে পরিবর্তনের চেষ্টা নিয়েও তখন ব্যাপক আলোচনা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিএনপি খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেয়।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়।
খালেদা জিয়াকে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। আরাফাত রহমান কোকোকেও চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেন এবং ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সেখানে মৃত্যুবরণ করেন।
এক-এগারোর কারাবন্দিত্ব
গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়াকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার একটি বাড়িতে সাবজেল হিসেবে আটক রাখা হয়। একই সময়ে তাঁর দুই ছেলেকেও কারাবন্দি করা হয়। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও আমলাদেরও গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকলেও বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঐক্যের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠেন। দলের নেতৃত্বে ভাঙন ধরানোর বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান দলটির সাংগঠনিক সংহতি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে।
এক-এগারো পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। জরুরি অবস্থা জারি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশে একটি ভিন্নধারার রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসে।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে। বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে দলটি বিরোধী দলে পরিণত হয়। খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই বিজয়ী হন এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক বিরোধ ও গুলশানের বাড়ি ছাড়ার ঘটনা
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা দেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর দীর্ঘদিনের বাসভবন, ঢাকার শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করা হয়। বাড়িটি তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে এটি জিয়া পরিবারের আবাসস্থল ছিল। বাড়ি ছাড়ার সময় তিনি এ ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন হিসেবে উল্লেখ করেন। ঘটনাটি বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ও নতুন সংকট
২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো আন্দোলন শুরু করে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি ক্রমেই বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক দলের বর্জনের কারণে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। নির্বাচনের আগে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিরোধী দলের আন্দোলন, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ সময় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান, তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা হয়।
মামলা ও কারাবরণ
বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের পর তাঁকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। পরে উচ্চ আদালতের রায়ে তাঁর সাজা বাড়ানো হয়।
এ ছাড়া জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতেও তাঁকে দণ্ডিত করা হয়। খালেদা জিয়ার দল ও সমর্থকদের দাবি ছিল, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে মামলাগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের নিজস্ব আইনগত অবস্থান ছিল।
কারাবন্দিত্ব ও অসুস্থতা
কারাবন্দি অবস্থায় খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। বিভিন্ন জটিলতায় তিনি দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে সরকার নির্বাহী আদেশে তাঁকে শর্তসাপেক্ষে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। এরপর থেকে তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অনেকটাই দূরে থাকেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নেয়। নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি ভোটের পরিবেশ, সহিংসতা ও অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ তোলে। দলটির অনেক প্রার্থী প্রচারণায় বাধা, হামলা ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ করেন।
নির্বাচনে বিএনপি জোট অল্প কয়েকটি আসনে জয় পায়। খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকায় নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি। নির্বাচনের পরও বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি অব্যাহত রাখে।
আন্দোলন ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
নিরপেক্ষ নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবিতে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যায়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও বিএনপি ও বেশ কয়েকটি বিরোধী দল বর্জন করে। নির্বাচনের বৈধতা, অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়।
নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বসহ বহু নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন এবং বিপুলসংখ্যক মামলা হয়। এই সময়েও শারীরিকভাবে অসুস্থ খালেদা জিয়া বিএনপির রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত ছিলেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তি
২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন ক্রমে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ১৬ জুলাই রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষও আন্দোলনে যুক্ত হয়।
আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার একপর্যায়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
এরপর খালেদা জিয়ার মুক্তির পথও সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়। দীর্ঘ কারাবাস, শর্তসাপেক্ষ মুক্তি ও অসুস্থতার পর তিনি কার্যত রাজনৈতিক ও আইনি বাধামুক্ত হন।
জীবনের এই দীর্ঘ অধ্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া কখনো ছিলেন সরকারপ্রধান, কখনো বিরোধীদলীয় নেত্রী, আবার কখনো কারাবন্দি ও অসুস্থ এক রাজনৈতিক নেত্রী। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে গণতন্ত্র ও নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলনে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্ব। বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েক দশকের উত্থান-পতনের সঙ্গে তাঁর জীবন ও সংগ্রাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।