সংরক্ষিত নারী আসন

কারা পাচ্ছেন বিএনপির মনোনয়ন?

সংরক্ষিত নারী আসন
  © ফাইল ছবি

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরম বিক্রি আজ থেকে শুরু হচ্ছে। তাই ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি শিবিরে এ নিয়ে বইছে তীব্র প্রতিযোগিতা। কারা পাচ্ছেন দলের মনোনয়ন এ নিয়ে সর্বত্র গুঞ্জন চলছে। 

জানা গেছে, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির স্থায়ী কমিটি সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিধান থাকলেও বাস্তবে ভিন্ন কিছু দেখার অপেক্ষায় আছে সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কারণ সবকিছু শেষে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই দলীয় প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন এমনটিই নিশ্চিত করেছেন নেতারা। যদিও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এ মনোনয়ন চূড়ান্ত করার বিধান রয়েছে বিএনপির গঠনতন্ত্রে।

সূত্র জানায়, চলমান সংসদে সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে কমপক্ষে শতাধিক হবু নারী এমপি প্রার্থী তাকিয়ে আছে তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের পানে। কারণ সবকিছু শেষে তিনিই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করবেন। 

জানা গেছে, বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে যারা বেশি সক্রিয় ছিল তারা খুব জোরেশোরে লবিং তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বলছেন, তাদের অবদান বিবেচনা করেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্ধারণ করবেন কারা সংরক্ষিত নারী আসনে যাবেন। তবে বিগত দিনে খুব বেশি সক্রিয় না থাকলেও স্বামী বা বাবার কোটায়ও অনেক প্রার্থী সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হতে ধর্না দিচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান ও অন্য প্রভাবশালী নেতাদের কাছে। 

নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, সাধারণ আসনে প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন বণ্টন করা হবে। সেই হিসেবে বিএনপি জোট ৩৭টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং একজন স্বতন্ত্র সদস্য একটি আসন পেতে যাচ্ছে। 

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে রাজপথে সক্রিয় ত্যাগী নেত্রী, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নির্যাতন ও গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ঔ সূত্র। এরমধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান, মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা এবং সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খানের নাম আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। তবে এদের পাশাপাশি এবার তরুণ নেত্রীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনা বেড়েছে ঔ সূত্র জানায়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি এবং জোটগতভাবে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে।  এই হিসাব অনুযায়ী দলটি কমপক্ষে ৩৭টি আসন পেতে পারে। এই আসনগুলোতে দলীয় মনোনয়ন পেতে কমপক্ষে শতাধিক মহিলা নেত্রী জোর লবিং করে যাচ্ছেন। এরমধ্যে দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতাদের স্ত্রী সন্তানও রয়েছে। তারা তাদের স্ত্রী সন্তানদের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে লবিং করছেন। যদিও দলের স্থায়ী কমিটি সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিধান রয়েছে। তবে সবকিছু শেষে দলের চেয়ারম্যানই শেষ ভরসা। 

এদিকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সহধর্মিণী হাসিনা আহমেদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সহধর্মিণী রুমানা মাহমুদ এবং হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সহধর্মিণী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি। অতীতে তাদের অনেকেই নিজ নিজ স্বামীর অবর্তমানে সংশ্লিষ্ট আসনে বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন।

এদিকে, দলের কেন্দ্রীয় নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে শাম্মী আক্তার, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, নিলোফার চৌধুরী মনি ও রেহেনা আক্তার রানুর নামও আলোচনায় রয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভীন ও কনক চাঁপাও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রয়েছেন। একই সঙ্গে আইন ও পেশাজীবী অঙ্গন থেকেও একাধিক নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট সিমকী ইমাম খান, সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের কন্যা ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা উল্লেখযোগ্য। 

এছাড়া, বিএনপির নেতাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায়ের কন্যা অপর্ণা রায়, ড. আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহারীন খান, সাবেক এমপি প্রয়াত আমান উল্লাহ চৌধুরী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী প্রয়াত বেগম রাহিজা খানম ঝুনুর কন্যা নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী, লন্ডন বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমেদের কন্যা সাবরিনা খান, বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের কন্যা ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুনি ও পুত্রবধূ খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি নামও আলোচনায় রয়েছে। তিনি রাজধানীর মিরপুরের সাবেক কাউন্সিলর সাইদুর রহমান নিউটনের সহধমির্ণী ও ফ্যাসিবাদী আমলে বিডিআর হত্যা মামলায় জেলখানায় আটক থাকাকালে নিহত লালবাগের সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন।

আরও আলোচনায় রয়েছেন, ঢাকা জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের রোকেয়া হলের সাবেক সভাপতি ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সেলিনা সুলতানা নিশিতা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, নাদিয়া পাঠান পাপন, মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, নেওয়াজ হালিমা আর্লি, সহ-আর্ন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নী, বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসিরুদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী সাবরিনা শুভ্র, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইনসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাজমেরি ইসলাম, অধ্যাপক তাহমিনা বেগম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. নাহারিন খান, ডা. সৈয়দা তাজনিন ওয়াইরিস সিমকি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সংসদের সাবেক ভিপি সেলিনা হোসেন। 

এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর কন্যা সামিরা তানজিনা চৌধুরী, সিলেটের সাবেক সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেনের কন্যা সৈয়দা আদিবা হোসেন,। এছাড়া, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা, সানজিদা ইসলাম তুলি, নাদিরা চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানের নাম থাকতে পারে পারে বলেও গুঞ্জন চলছে।

তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে তাদের অবদান বিবেচনা করেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্ধারণ করবেন কারা সংরক্ষিত নারী আসনে যাবেন। সেক্ষেত্রে এবার তরুণ নেত্রীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানা গেছে। 

জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করবে দলের স্থায়ী কমিটি। যোগ্য ও কার্যকর প্রার্থীদেরই মনোনয়ন দেবে দল। আমি দলের চেয়ারম্যানের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বলতে পারি, তিনি সময়োপযোগী সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে যোগ্যদেরই বাছাই করবেন।

এছাড়া চেয়ারম্যানের উপদেষ্ঠা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপিতে অসংখ্য যোগ্য নেত্রী রয়েছেন। বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে তাদের অবদান বিবেচনা করেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্ধারণ করবেন কারা সংরক্ষিত নারী আসনে যাবেন। যদিও সম্ভ্যাব্য আলোচিত প্রার্থীদের নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি এবং জোটগতভাবে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে। নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, সাধারণ আসনে প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন বণ্টন করা হবে। সেই হিসেবে বিএনপি জোট পেতে যাচ্ছে ৩৬টি আসন, জামায়াত জোট ১৩টি এবং একজন স্বতন্ত্র সদস্য একটি আসন পাবেন।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল গতকাল বুধবার (৮ এপ্রিল) ঘোষণা করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ২১ এপ্রিলের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে, বাছাই হবে ২২ এপ্রিল ও ২৩ এপ্রিল, প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল এবং ১২ মে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

এজন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) থেকে শুরু হচ্ছে। এদিন বেলা ১১টা থেকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হবে, চলবে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এ তথ্য জানিয়েছেন। রিজভী জানান, একই দিন থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়া যাবে। মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমার শেষ দিন ১২ এপ্রিল।

ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানান, ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২১ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। আখতার আহমেদ জানান, আপিল দায়েরের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ এপ্রিল। আপিল নিষ্পত্তি হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল। প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৩০ এপ্রিল। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ মে। সংরক্ষিত নারী আসনের বণ্টন প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, বিএনপি ও তাদের জোটের জন্য ৩৬টি আসন নির্ধারণ করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট পাবে ১৩টি আসন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে ১টি আসন। সব মিলিয়ে মোট আসন সংখ্যা ৫০টি।


মন্তব্য