হাসনাতের বক্তব্যে দিশেহারা ভারত
বাংলাদেশি হাইকমিশনারকে নয়াদিল্লির তলব, মুখ্যমন্ত্রীর হুশিয়ারী
- বিশেষ প্রতিনিধি:
- প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:২২ PM , আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:২২ PM
সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর ভারতের সেভেন সিস্টার ইস্যুতে দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নড়েচড়ে উঠেছে ভারত সরকার। বাংলাদেশের এ তরুণ তুর্কী নেতার বক্তব্যে শুধু উদ্বেগেই নয় ভারত যেন রীতিমত দিশেহারা অবস্থায় আছে।
বাংলাদেশে ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিএম) বি শ্যাম তাকে তলব করেন।
ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করার তিন দিনের মাথায় এই পদক্ষেপ নিলো নয়াদিল্লি। বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের উদ্বেগের জায়গাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীকে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে সোমবার বিকালে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে হাসনাত আব্দুল্লাহ ভারতের আটটি রাজ্য নিয়ে গঠিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন।
তার এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতেই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা নিয়ে ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনকে কেন্দ্র করে ‘কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী’ যে ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, সেই দিকে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে যে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে ‘ভুয়া বয়ান’ বা অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা চলছে, ভারত তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
ভারত আরও অভিযোগ করেছে যে, এসব স্পর্শকাতর ঘটনার বিষয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করেনি এবং ভারতের সঙ্গে এই সংক্রান্ত কোনো অর্থবহ তথ্যপ্রমাণও বিনিময় করা হয়নি। কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় মিশন ও কূটনীতিকদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ। তারা বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
উল্লেখ্য, এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই বুধবার দুপুর থেকে ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রটি নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত রোববার বাংলাদেশ সরকার ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করেছিল। আজকের এই তলবের মধ্য দিয়ে দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা মঙ্গলবার বলেছেন, বাংলাদেশে যদি কিছু নেতা ভারতকে হুমকি দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার কথা বলতে থাকেন, তবে নয়া দিল্লি আর বেশিদিন নীরব থাকবে না। তিনি বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতকে বিচ্ছিন্ন করে সেটিকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান বারবার উঠে আসা বাংলাদেশের একটি খারাপ মানসিকতার প্রতিফলন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে এমন বক্তব্য আসছে যে- উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে তাদের সঙ্গে একীভূত করার কথা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশের এমনটা কল্পনাও করা উচিত নয়। তাকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য হিন্দু। এতে বলা হয়, ভারত একটি বড় দেশ, পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। এ কথা উল্লেখ করে হিমান্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে একটি ভুল মানসিকতা তৈরি হয়েছে। তাদের সাহায্য করা আমাদের উচিত নয়। বরং পরিষ্কার করে জানিয়ে দেয়া উচিত- এ ধরনের আচরণ ভারতের বিরুদ্ধে হলে আমরা নীরব থাকব না।
রিপোর্টে বলা হয়, সোমবার বাংলাদেশের সদ্য গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ মন্তব্য করেন, ভারতের আটটি রাজ্য নিয়ে গঠিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত। তার প্রতিক্রিয়াতেই আসামের মুখ্যমন্ত্রীর ওই মন্তব্য। হাসনাত আবদুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমি ভারতকে বলতে চাই- আপনারা যদি আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকার মানে না এমন লোকদের আশ্রয় দিতে থাকেন, তবে আমরাও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেব এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করে দেব।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমর্থকদের বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দিতে ভারত অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে।
রিপোর্টে বলা হয়, এটাই প্রথম নয়- এর আগেও বাংলাদেশি নেতাদের কাছ থেকে এমন হুমকি এসেছে। এ বছরের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ভারতের পূর্ব দিকের সাতটি রাজ্য একটি স্থলবেষ্টিত অঞ্চল। তাদের সমুদ্রে পৌঁছানোর কোনো পথ নেই। সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক আমরা। পরবর্তীতে বাংলাদেশি নেতাদের হুমকির ভাষা ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের দিকে ঘুরে যায়- যা পশ্চিমবঙ্গের মাত্র ২২ থেকে ৩৫ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি অংশ এবং সেটা উত্তর-পূর্ব ভারতকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করে। এ প্রসঙ্গে আসামের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতকে হুমকি দেয়ার আগে বাংলাদেশের উচিত তাদের নিজের দুটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ চিকেনস নেকের দিকে নজর দেয়া। এর মধ্যে একটি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর থেকে মেঘালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম গারো হিলস পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ। অন্যটি হলো দক্ষিণ ত্রিপুরা থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম করিডর।