জলবায়ু ঝুঁকির ফান্ডই এখন লুটের ‘ঝুঁকিতে’
- মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
- প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫০ PM , আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৮ PM
বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য ০.৪৮ শতাংশেরও কম। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত ঝুঁকির কারণে দেশটি বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র। ঘূর্ণিঝড়, তীব্র তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন ও উপকূলীয় লবণাক্ততা দিন দিন দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উৎস মিলিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অর্থায়ন হচ্ছে খুবই সামান্য। এর মধ্যেই অভ্যন্তরীণ জলবায়ু তহবিলে দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশের জোরালো কূটনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ তহবিল ব্যবস্থাপনাতেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জলবায়ু মোকাবিলায় পাওয়া সীমিত অর্থও কাঙ্ক্ষিত কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।
বাড়ছে জলবায়ুর অভিঘাত
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের খাদ্য ও কৃষি খাতে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমে এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং উপকূলীয় লবণাক্ততা দেশের প্রধান ফসল আমন, বোরো ও আউশ উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি মাঝারি থেকে তীব্র লবণাক্ততার কবলে পড়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জোয়ারের পানির কারণে উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তার বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বোরো চাষে। বিভিন্ন প্রাক্কলন অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে বোরো ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে।
এদিকে উত্তরাঞ্চলেও তাপপ্রবাহ কৃষির জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে। রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো ধানের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ধানের ফুল ফোটার সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে চিটা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
হাওরাঞ্চলেও দেখা দিচ্ছে ভিন্ন ধরনের সমস্যা। সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগাম আকস্মিক বন্যায় ফসল কাটার আগেই বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে সেচের জন্য গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের আবহাওয়ার ধরন ক্রমেই চরম ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। একই মৌসুমে কৃষকদের খরা ও বন্যার মতো বিপরীতমুখী সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত জলবায়ু-সহিষ্ণু ফসলের জাত মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।
প্রয়োজন বিপুল অর্থ, মিলছে সামান্য
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হলেও ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস মিলিয়ে গড়ে বছরে মাত্র ৮৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০০৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশ পেয়েছে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। দেশের ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান ২০২৩-২০৫০’ বাস্তবায়নেও প্রয়োজন প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। বাংলাদেশের মূল বক্তব্য ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলোর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এর আর্থিক বোঝা বহন করতে হবে না।’
কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থায়নের জন্য জোরালো দাবি জানালেও দেশের অভ্যন্তরীণ জলবায়ু তহবিলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
জলবায়ু তহবিলে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ
বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবির) গবেষণায় অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
‘বাংলাদেশে জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় নেওয়া ৮৯১টি প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের ৫৪ শতাংশের বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
গবেষণায় প্রকল্প অনুমোদন, ঠিকাদার নিয়োগ এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ, ঘুষ ও অনিয়মের নানা তথ্যও উঠে এসেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্য থেকেও জলবায়ু তহবিলের বিপুল অর্থ রাজনৈতিক প্রভাব ও যোগসাজশের মাধ্যমে অপচয় বা লুটপাট হয়েছে। তার মতে, অভ্যন্তরীণ তহবিলের দুর্বল জবাবদিহি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য নেতিবাচক।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর কাছে অনুদান দাবি করছে। কিন্তু দেশের ভেতরে পাওয়া অর্থের ব্যবহার স্বচ্ছ না হলে আন্তর্জাতিক তহবিল পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে তহবিল ব্যবস্থাপনায় তৃতীয় পক্ষের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
প্রকল্প শেষ হতে লাগে বছরের পর বছর
টিআইবির গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জাতীয় জলবায়ু তহবিলের আওতায় নেওয়া ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রকল্পের মেয়াদ যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বাড়ানো হয়েছে। এতে গড় প্রকল্পের সময়কাল ১৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এমনকি চার বছর মেয়াদি কোনো কোনো প্রকল্প শেষ করতে ১৪ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প প্রয়োজন। কিন্তু প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও অর্থের অপব্যবহার অভিযোজন কার্যক্রমের কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।
পানি বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতি শক্তিশালী হলেও মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে হবে। উপকূলীয় বাঁধগুলোকে শুধু উঁচু করলেই হবে না, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সেগুলোকে জলবায়ু-সহনশীল করে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় শঙ্কা খাদ্য নিরাপত্তায়
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শুধু পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য উৎপাদন ও মানুষের জীবনযাত্রায়।
উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। ভূগর্ভস্থ পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও তীব্র হচ্ছে। এর প্রভাব বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ওপর বেশি পড়ছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষিবিজ্ঞানী ড. মো. শাহজাহান কবীর জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, লবণাক্ততা ও খরা বাংলাদেশের কৃষির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে লবণাক্ততা ও খরা-সহনশীল বিভিন্ন ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এগুলো দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সাফল্যের পাশাপাশি দরকার ঘর গোছানো
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল এবং উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থায়নের দাবিতে দেশের অবস্থানও বেশ জোরালো।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব ধরে রাখার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় বাঁধ, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে।
কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থের সংকট যেমন বড় সমস্যা, তেমনি পাওয়া অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারাও কম বড় সংকট নয়। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ একদিকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো, অন্যদিকে দেশের ভেতরের তহবিলকে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা।