অনিশ্চয়তায় ২০ হাজারের বেশি যাত্রী
হজ কোটায় দুই বছরে বাংলাদেশের বিপরীত অবস্থান
- কামরুজ্জামান বাবলু
- প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১ PM , আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১ PM
একসময় বড় কোটা পেয়েও তা পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। আর এখন কমে যাওয়া কোটার সব আসন প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও ২০ হাজারের বেশি মানুষ হজে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশকে ১,২৭,১৯৮ জনের হজ কোটা দিলেও তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালের প্রাথমিক নিবন্ধন শেষে ৮৩,৫২৭ জন নিবন্ধন করায় ৪৩,৬৭১টি আসন খালি ছিল।
কিন্তু ২০২৭ সালের জন্য বাংলাদেশের কোটা কমিয়ে ৭৮,৫০০ জন নির্ধারণ করার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। নির্ধারিত কোটা প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় আরও ২০ হাজারের বেশি প্রাক-নিবন্ধিত হজযাত্রী এখন অতিরিক্ত কোটার অপেক্ষায় রয়েছেন।
ফলে সৌদি আরব অতিরিক্ত কোটা না দিলে এসব হজযাত্রীর বড় একটি অংশ আগামী বছর পবিত্র হজ পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
হজ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ২০২৭ সালের কোটা কমে যাওয়াকে শুধু সৌদি আরবের একক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং গত কয়েক বছরে বড় কোটা পূরণ না হওয়া, বাংলাদেশের হজযাত্রীদের জন্য তুলনামূলক বেশি ব্যয় এবং মানুষের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপও বিষয়টি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, এবার বিমানভাড়া কমানো, প্যাকেজ কাঠামোয় পরিবর্তন এবং আগের কয়েক বছরের তুলনায় মানুষের আর্থিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে হজে যাওয়ার আগ্রহ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এতে তৈরি হয়েছে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য- যে বাংলাদেশ একসময় বড় কোটা পেয়েও তা পূরণ করতে পারেনি, সেই বাংলাদেশই এখন ৭৮,৫০০ আসনের বাইরে থাকা আরও ২০ হাজারের বেশি মানুষকে হজে পাঠানোর জন্য অতিরিক্ত কোটা চাইছে।
বড় কোটা, কম অংশগ্রহণ
সূত্র জানায়, কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ১,২৭,১৯৮ জনের হজ কোটা পেয়ে আসছিল। ২০২৪ সালেও একই পরিমাণ কোটা ছিল। কিন্তু ওই বছর ৮৫,২৫৭ জন বাংলাদেশি হজ পালন করেন। ফলে প্রায় ৪২ হাজার আসন অব্যবহৃত থাকে।
২০২৫ সালের জন্যও ১,২৭,১৯৮ জনের কোটা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাথমিক নিবন্ধন শেষে মাত্র ৮৩,৫২৭ জন নিবন্ধন করায় ৪৩,৬৭১টি আসন খালি থেকে যায়।
২০২৫ সালে শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যসহ প্রায় ৮৭,১০০ জন বাংলাদেশি হজ পালন করেন। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৯,১০০ জন।
অর্থাৎ, টানা কয়েক বছর বাংলাদেশের প্রকৃত হজযাত্রীর সংখ্যা সৌদি আরবের নির্ধারিত কোটার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।
হজের ব্যয়ও বড় প্রশ্ন
হজ-সংশ্লিষ্টদের মতে, এই দীর্ঘদিনের কম চাহিদার অন্যতম কারণ হজের উচ্চ ব্যয়।
২০২৪ সালে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, হজের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। একই সময়ে তুলনামূলক কম খরচে ওমরাহ পালন করা সম্ভব হওয়ায় অনেকে হজের পরিবর্তে ওমরাহর দিকে ঝুঁকছেন বলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল।
ওই বছর সর্বনিম্ন সরকারি হজ প্যাকেজের মূল্য ছিল ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৮৪০ টাকা। হজ-সংশ্লিষ্টদের তখনকার হিসাবে, প্রায় দেড় লাখ টাকার মধ্যে ওমরাহ পালন করা সম্ভব ছিল।
ফলে বাংলাদেশের মতো দেশে একটি পরিবারের জন্য একসঙ্গে পাঁচ-ছয় লাখ টাকা বা তার বেশি ব্যয় করা বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত। মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ থাকায় হজের ব্যয় চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাবের মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, হজের কোটা পূরণ না হওয়ার একটি কারণ হচ্ছে ওমরাহ নিয়ে ভুল প্রচার। অনেক মানুষকে ‘ছোট হজ’ বলে ওমরাহ পালনে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, গত বছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ওমরাহ পালন করেছেন। তাদের একটি অংশ হজে গেলে বাংলাদেশের হজের কোটা পূরণের সম্ভাবনা থাকত।
তবে একই সঙ্গে তিনি হজের ব্যয়ের বিষয়টিও স্বীকার করেন। তাঁর মতে, মানুষের আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেকেই হজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
হাব সভাপতি সৈয়দ গোলাম সরওয়ার বলেন, মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং হজের ব্যয় বেড়ে যাওয়া- দুটিই হজযাত্রীর সংখ্যা কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
সৌদি খরচও বড় অংশ
হজের মোট ব্যয়ের বড় অংশ সৌদি আরবের আবাসন, পরিবহন, মিনা ও আরাফাতের সেবা, খাবারসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়।
সম্প্রতি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ জানিয়েছেন, হজের মোট ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সৌদি আরবের বিভিন্ন খাতে এবং বাকি এক-চতুর্থাংশ বিমানভাড়াসহ বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় হয়।
২০২৭ সালের হজের ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ মক্কা ও মদিনার আবাসন, পরিবহন, ক্যাটারিং, তাঁবু ও অন্যান্য সেবাকে সমন্বিত সার্ভিস প্যাকেজের আওতায় এনেছে। আগের চারটি সার্ভিস ক্যাটাগরির পরিবর্তে তিনটি করা হয়েছে এবং হাফ-বোর্ড ক্যাটারিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ ছাড়া মিনা ও আরাফাতের সর্বনিম্ন সার্ভিস ক্যাটাগরি বাতিল করায় একজন হজযাত্রীর ব্যয় প্রায় ৭০০ সৌদি রিয়াল বা ২৩,২৪০ টাকা বেড়েছে বলে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এর সঙ্গে খাবারের জন্য ৩৯,৫০৮ টাকা এবং রিয়ালের বিনিময় হার সমন্বয়ের কারণে আরও ৩,৮২৫ টাকা যোগ হয়েছে।
বিমানভাড়া কমলেও প্যাকেজ পাঁচ লাখের বেশি
২০২৭ সালের জন্য সর্বনিম্ন সরকারি হজ প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সর্বনিম্ন প্যাকেজের মূল্য ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা।
সরকার এবার হজের বিমানভাড়া কমিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪,৮৩০ টাকা কম।
তবে বিমানভাড়া কমলেও সর্বনিম্ন সরকারি প্যাকেজের ঘোষিত মূল্য ২০২৬ সালের ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৩৭ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৭ সালে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা হয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় অবশ্য বলছে, দুই বছরের প্যাকেজ সরাসরি তুলনা করলে প্রকৃত ব্যয়ের চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ ২০২৭ সালের প্যাকেজে খাবারসহ কিছু ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগের প্যাকেজে আলাদাভাবে বহন করতে হতো। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, একই মানের সেবা বিবেচনায় প্রকৃত ব্যয় কমেছে।
এবার চাহিদা কেন বেড়েছে?
২০২৭ সালের নিবন্ধন পরিস্থিতি আগের কয়েক বছরের তুলনায় ভিন্ন। হজ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ৭৫,৯১৮ জন নিবন্ধন করেছেন। ফলে ৭৮,৫০০ কোটার মধ্যে মাত্র ২,৫৮২টি আসন অবশিষ্ট ছিল।
হাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এবার নিবন্ধনে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। বিগত বছরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটায় হজ পালনে আগ্রহ বেড়েছে বলে সংগঠনটি মনে করছে।
এ ছাড়া বিমানভাড়া কমানো এবং হজের প্যাকেজে বিভিন্ন খরচ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও চাহিদা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে শুধু ব্যয় কমার কারণে এবার চাহিদা বেড়েছে- এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে যেতে নারাজ হজ-সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, মানুষের আর্থিক সক্ষমতা, আগের কয়েক বছরের স্থগিত সিদ্ধান্ত এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি- সবকিছু মিলেই এবার নিবন্ধনে বেশি সাড়া পড়েছে।
অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটা চায় হাব
এদিকে নির্ধারিত কোটা পূরণ হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত ২০ হাজার হজযাত্রীকে সুযোগ দিতে সৌদি আরবের কাছে কোটা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে হাব।
সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার লিখিত বক্তব্যে এবং সভাপতি সৈয়দ গোলাম সরওয়ার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সৌদি সরকার ২০২৭ সালের জন্য বাংলাদেশের কোটা ৭৮,৫০০ জন নির্ধারণ করলেও প্রায় ২০ হাজার হজযাত্রী বর্তমানে অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন।
এ সংকট নিরসনে পূর্বে নির্ধারিত ১,২৭,১৯৮ জনের মূল কোটা পুনর্বহাল অথবা অন্তত ২০ হাজার অতিরিক্ত কোটা বরাদ্দের আবেদন জানানো হয়েছে।
এর আগে রোববার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে দেওয়া আবেদনে হাব জানায়, নির্ধারিত ৭৮,৫০০ জনের কোটা পূর্ণ হয়ে গেছে এবং এর বাইরে আরও ২০ হাজারের বেশি হজযাত্রী নিবন্ধনের সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই হজ পালনের জন্য মানসিক ও আর্থিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন।
হাবের আবেদনে বলা হয়, এসব হজযাত্রীকে সুযোগ দিতে সৌদি সরকারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, ২০২৩ সালের হজ কার্যক্রমের পর ব্লক করা অ্যাকাউন্টে আটকে থাকা প্রায় ৩০ লাখ সৌদি রিয়াল ফেরত আনার বিষয়েও প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
সৌদি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিবন্ধিত হজযাত্রীর সংখ্যা নির্ধারিত কোটার বেশি হলে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। চূড়ান্ত নিবন্ধন শেষে বাংলাদেশের হজযাত্রীর সংখ্যা সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
ধর্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, কোটা পূরণ না হলে ভবিষ্যতে কোটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকার কোটা পূরণে কাজ করছে এবং এ নিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে।
হজ-সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনার সামনে দুটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। প্রথমত, শুধু বড় কোটা পেলেই তা পূরণ হবে না; হজের ব্যয় ও মানুষের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, এবার কম কোটা নির্ধারণের পর যে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোটা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
এর আগে অতিরিক্ত কোটা পাওয়া না গেলে বর্তমান ৭৮,৫০০ আসনের বাইরে থাকা ২০ হাজারের বেশি হজযাত্রীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থেকে যাবে।
এবারের পরিস্থিতি তাই বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় একটি উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য সামনে এনেছে-বড় কোটা থাকা অবস্থায় যেখানে আসন খালি থেকেছে, সেখানে ছোট কোটা পাওয়ার পরই অতিরিক্ত আসনের জন্য সৌদি আরবের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১৬ মে ২০২৭ পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।