পাল্টা হামলা
- বাংলাকণ্ঠ ডেস্ক
- প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৭ PM , আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৭ PM
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র আকার নিয়েছে। শুক্রবার দিবাগত রাতেও ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে টানা সাত রাত মার্কিন হামলায় কেঁপে উঠেছে দেশটি। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান।
দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহন পথ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
সংঘাত শুরুর পর হরমুজ প্রণালির কাছে একটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে মার্কিন মেরিন সেনারা। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাংশে মাইন পাতা এলাকায় চলাচলের সময় দুটি ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে জাহাজ দুটিতে আগুন ধরে যায়। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী আইআরজিসির এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে একে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উল্লেখ করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, বাহরাইনে মার্কিন ড্রোনের একটি ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।
এদিকে ইয়েমেন উপকূলে আরেকটি জাহাজ আটক করার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব দিয়েও জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইআরজিসির বরাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ওই অঞ্চল থেকে রাসায়নিক সার, তেল ও গ্যাস রপ্তানি বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে চারটি জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইরানি বাহিনী।
যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর গত সপ্তাহ থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে ইরান আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযানে যেতে বাধ্য হবে। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে হামলা চলতে থাকলে ইরান পূর্ণাঙ্গ আক্রমণাত্মক অভিযানের পর্যায়ে প্রবেশ করবে।
ইরানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিঘেঁষা হরমুজগান প্রদেশে শনিবার ভোরে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ‘শত্রুপক্ষ’। এতে তিনজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। হামলায় ওই এলাকার দুটি সেতু ও একটি সড়ক টানেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনায় মার্কিন হামলার খবর দেয় দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। তাদের দাবি, দক্ষিণাঞ্চলে অন্তত পাঁচটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খামির বন্দরের কাছে হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়। এ ছাড়া ওই এলাকার একটি রেলস্টেশন এবং পাকিস্তান সীমান্তবর্তী ইরানশাহর প্রদেশের একটি বিমানবন্দরও হামলার শিকার হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার কথা নিশ্চিত করেছে ইরান। বাহরাইন, কাতার ও কুয়েতসহ কয়েকটি দেশে হামলার দাবি করেছে তেহরান। পাশাপাশি ভারত মহাসাগরের উত্তরে অবস্থানরত একটি মার্কিন জাহাজে হামলা চালানোর দাবিও করেছে আইআরজিসি।
কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের হামলায় দেশটির একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও একটি পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের ড্রোন হামলার জবাব দিয়েছে।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, বাহরাইনে মার্কিন ড্রোনের মজুতাগারে হামলা চালানো হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ এআই কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান জানালেও, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারিতে সংকট আরও গভীর হচ্ছে।