কৌশলগত ভারসাম্যের নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী
ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী, মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  © কোলাজ: বাংলাকণ্ঠ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের তিন দিনের ঢাকা সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি কয়েকটি অপ্রত্যাশিত ঘটনাও এ আলোচনা আরও জোরালো করেছে।

সফরের প্রথম দিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর সাধারণত যেভাবে যৌথ সংবাদ সম্মেলন বা আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়, এবার তা হয়নি। একইসঙ্গে সার্জিও গোরের সম্মানে নির্ধারিত নৈশভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়। এসব পরিবর্তনের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

তবে বৈঠকের পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সার্জিও গোর জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা লেভেল-৩ থেকে লেভেল-২-এ নামিয়ে এনেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা বহাল থাকবে, তবুও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশকে এখন ভ্রমণের জন্য অধিকতর নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

পরবর্তীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ভ্রমণ সতর্কতার উন্নয়ন বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা আস্থার প্রতিফলন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতার ফলেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

একই দিনে আরেকটি এক্স বার্তায় সার্জিও গোর বলেন, বাংলাদেশের প্রথম সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত অংশীদারত্ব, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, অভিবাসন, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়, যখন পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সার্জিও গোর বৈঠক করেন। বৈঠকটি সম্পর্কে বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

এদিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সার্জিও গোরের সম্মানে নির্ধারিত নৈশভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ার বিষয়টিও কূটনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় সফরে কর্মসূচি পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। তবে কারণ প্রকাশ না করলে স্বাভাবিকভাবেই নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা সামনে এলেও সেগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

গত কয়েক সপ্তাহে ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যম ও কৌশলগত বিশ্লেষণমাধ্যম সার্জিও গোরের ঢাকা সফর নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সেখানে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশের চীনমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল—এসব বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরও কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠকের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কী ছিল। যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকের সব বিষয় প্রকাশ করা হয় না। সংবেদনশীল আলোচনা কিংবা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে অনেক বিষয় গোপন রাখাই আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রচলিত রীতি।

এ পর্যন্ত বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারতের কোনো সরকারই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণগুলোর পক্ষে বা বিপক্ষে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। ফলে এসব বিশ্লেষণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে কোনো বিষয় সার্জিও গোরের সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে ছিল—এমন তথ্যভিত্তিক প্রমাণও প্রকাশ্যে আসেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের চীনমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঢাকা, ওয়াশিংটন, বেইজিং ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল। ফলে উচ্চপর্যায়ের প্রতিটি সফরই স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, নতুন সরকারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার অগ্রাধিকার নির্ধারণই সার্জিও গোরের সফরের প্রধান উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়েই মূল আলোচনা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ একদিকে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রেখেছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্য যেমন নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও বাড়াচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা, অবকাঠামো ও জ্বালানি সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, এসব বিষয় সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকে আলোচিত হয়নি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, সার্জিও গোরের এবারের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় উচ্চপর্যায়ের সফর। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ ঢাকা সফর করেন। ফলে এটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো সফর নয়, বরং বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)' বাস্তবায়ন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও গম আমদানি বৃদ্ধি, বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ের সম্ভাবনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে দুই দেশের কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, রোহিঙ্গা সংকট, আঞ্চলিক সংযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে সার্জিও গোরের সফরকে কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বৃহত্তর কৌশলগত প্রেক্ষাপটেও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।


মন্তব্য