যেভাবে ২৩তম রাষ্ট্রপতি হলেন মির্জা ফখরুল
- মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, জাতীয় সংসদ থেকে
- প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২২ PM , আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২২ PM
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদকে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি।
দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোটার থাকলেও ভোট পড়েছে ৩৪৩টি। এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
ভোটগ্রহণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পর রাষ্ট্রপতি পদে নিজের ভোট দেন মির্জা ফখরুল। এ সময় সংসদ সদস্যরা করতালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান। সংসদে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যরা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটেছে। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাঁকে বিএনপির মহাসচিব, সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হবে। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এসব পদ থেকে পদত্যাগ করবেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে বঙ্গভবনে
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপির দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতা এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিদেশে অবস্থানের সময়ে তিনি দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এক দশকেরও বেশি সময় বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সংগঠনটির এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করলে তিনি আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান।
সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ
১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষকতা থেকে অব্যাহতি নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।
এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। ২০১১ সালের ২০ মার্চ দলের তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। প্রায় পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরপর থেকে দলটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তিনি।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন মির্জা ফখরুল। ২০০১ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সরকার গঠনের পর তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন তিনি এবং বগুড়া-৬ থেকে নির্বাচিত হন। তবে শপথ না নেওয়ায় পরে তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।
সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পরে নবগঠিত সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মনোনীত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ।
ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল। শুক্রবার (২১ আগস্ট) শপথ নেওয়ার পর বঙ্গভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, দলীয় নেতৃত্ব ও সংসদীয় রাজনীতির নানা ধাপ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসতে যাচ্ছেন বিএনপির এই প্রবীণ নেতা।