প্রতিমন্ত্রী ফরহাদের ভিডিও কথন
- বাংলাকন্ঠ রিপোর্ট
- প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৫ PM , আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৫ PM
পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা ফরহাদ হোসেন আজাদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওতে থাকা নারী ফরহাদ হোসেন আজাদকে ‘ভাইয়া’ এবং প্রতিমন্ত্রী তাকে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করতেন।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। তবে দ্য ডিসেন্টের ফ্যাক্ট-চেক সূত্রমতে, ‘প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর ওই নারীর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ফরহাদ হোসেন।’
গত ২৮ জুলাই পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর একটি ২০ সেকেন্ডের ভিডিও ও একাধিক ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে পঞ্চগড়, বোদা ও দেবীগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী ও দলের স্থানীয় নেতাদের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে প্রতিপক্ষের নির্দেশে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে এসব ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর দলীয় নেতাকর্মীদের এআই দাবি খারিজ করে দিয়ে ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট জানিয়েছে, ছড়ানো ছবি ও ভিডিওগুলো এআই দিয়ে তৈরি নয়।
পঞ্চগড় ও ঢাকার স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত মূল ছবি, ভিডিও এবং হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিনশটের উচ্চ রেজল্যুশনের ফাইলগুলো এআই কনটেন্ট চিহ্নিতকরণে ব্যবহৃত একাধিক নির্ভরযোগ্য টুলে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু কোনোটিতেই এগুলো কৃত্রিম বা প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরির প্রমাণ মেলেনি।
হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের স্ক্রিনশট, একজন নারীর শাড়ি পরিহিত ছবিসহ নানা মাধ্যম ধরে দ্য ডিসেন্ট ওই নারীর পরিচয় জানায়, ওই নারী প্রতিমন্ত্রীর নিজ এলাকা পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের অধিবাসী। ১৯৯৫ সালের জুনে জন্ম নেওয়া ওই নারী বর্তমানে পড়ালেখার পাশাপাশি চাকরির সন্ধান করছেন। ছোটবেলায় বাবা হারানোর পর থেকে ফরহাদ হোসেনই তার পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তার মা ও এক ভাই আছেন।
সেই সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পাঁচপীর বাজারসহ আশপাশের এলাকায় সরেজমিনে তথ্যগুলো যাচাই করে একটি সহযোগী গণমাধ্যম । তবে অপরিচিত ভেবে প্রথমে অনেকে কথা বলতে রাজি হননি।
পরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী জানান, ভিডিওতে থাকা নারী ফরহাদ হোসেন আজাদকে ‘ভাইয়া’ এবং প্রতিমন্ত্রী তাকে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করতেন। ওই নারী গত নির্বাচনে প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। তিনি ঢাকাতে একাধিকবার মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে নিজ এলাকার নানা প্রকল্পের বরাদ্দ চেয়েছিলেন তিনি।
তারা আরও জানান, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ ও শাস্তির ভয়েই স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনে অংশ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিমন্ত্রীর কথামতো না চললে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার ও বরখাস্ত করার হুমকি, এমনকি প্রকাশ্য গায়ে হাত তোলা হয়। তার মনের মতো না হতে পারলে বা কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড কমিটি ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।
এদিকে প্রতিমন্ত্রীর ভিডিও সত্য হলেও মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় এটা নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ না করায় সামাজিকমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এর আগে সাতক্ষীরা-২ আসনের জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ মুহূর্ত দেখা গেছে।
এ ঘটনাকে ঘিরে দেশের মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ প্রকাশের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তাদের অভিযোগ গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো ধারাবাহিকভাবে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করলেও প্রতিমন্ত্রী ফরহাদের বিষয়ে নিরব থেকেছে। শুধু তাই নয়, অনেক মিডিয়া প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম আলো গাজী নজরুলকে নিয়ে ২০টি সংবাদ প্রকাশ করলেও ফরহাদকে নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি। কালের কণ্ঠ নজরুলকে নিয়ে ২৩টি এবং ফরহাদকে নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে, তা-ও পক্ষে। সমকাল গাজী নজরুলকে নিয়ে ২২টি সংবাদ প্রকাশ করলেও ফরহাদকে নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি।
এছাড়া আমার দেশ গাজী নজরুলকে নিয়ে ২০টি এবং ফরহাদকে নিয়ে একটি, আজকের পত্রিকা গাজী নজরুলকে নিয়ে ২০টি এবং ফরহাদকে নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে, তবে সেটাও মিথ্যা তথ্য দিয়ে পক্ষে। একইসঙ্গে ডেইলি স্টার গাজী নজরুলকে নিয়ে ১৫টি সংবাদ প্রকাশ করলেও ফরহাদকে নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি। অন্যান্য মূলধারার মিডিয়াগুলোও মুখে কুলুপ এঁটেছে বলে অভিযোগ নেটিজেনদের।
এ ঘটনায় মিডিয়ার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। অনেকেই সংবাদ নির্বাচনে ভারসাম্য, বস্তুনিষ্ঠতা ও সম্পাদকীয় নীতির প্রশ্ন তুলছেন। তাদের মতে, আলোচিত ঘটনাগুলোতে সমান গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হলে গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হতো।