বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

দল পেয়েছে দিশা, ত্যাগীরা বেদিশা

বিএনপি
  © সংগৃহীত

বাংলাশে জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আগামীকাল মঙ্গলবার। চতুর্থবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বিএনপি এমন একটি সময়ে ৪৮ বছরে পা রাখছে, যখন দলটি স্বৈরাচার আমলের দীর্ঘ জেল-জুলুম পেছনে ফেলে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে একটি অবাধ-নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয়ের মধ্য দিয়ে ফিনিক্স পাখির মত ক্ষমতায় এসেছে। যদিও বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব একে ক্ষমতা না বলে বরং দায়িত্ব বলছেন। অর্থাৎ দেশের জনগণের শান্তি-নিরাপত্তা, সুখ-সমৃদ্ধি ও সুশাসন নিশ্চিত করার পবিত্র দায়িত্ব এখন বিএনপি সরকারের ওপর। যেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

তবে যাদের ঘাম, শ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের যাতাকলে প্রায় নি:শেষ হতে যাওয়া দলটি  ফিরে পেয়েছে দিশা সেই ত্যাগিরা কিন্তু এখনো অনেকটাই বেদিশা হয়ে পথে প্রান্তরে ঘুরছেন বলে মনে করছেন অনেকে। তারা বলছেন, গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ত্যাগীদের মূল্যায়নের মাধ্যমে ইস্পাত-কঠিন রাজনৈতিক ঐক্যের উপর জোর দিচ্ছেন শীর্ষ নেতারা। শুধু তাই নয়, দলটি পুরনো বৃত্ত ভেঙে রাজনীতিতেও গুণগত পরিবর্তন আনতে চায়। যদিও গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং পরিবর্তনের এই পথটিও অনেক চ্যালেঞ্জের, কারণ ফ্যাসিবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র এখনো অব্যহত। 

তবে বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, এমন এক সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আর্দশে গড়া দল বিএনপি তাদের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে যখন পতিত স্বৈরাচার সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনসহ সর্বত্র তাদের আমলা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়েই সরকার চালাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। তাই একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ অন্যদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরনের চাপ-সব মিলিয়ে এক কঠিন বাস্তবতায় আছে দলটি। তার উপর গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সংকটের মত ইস্যুতো রয়েছেই। তবে এসব কিছু ছাপিয়ে একটি সুন্দর বাংলাদেশ বির্নিমানে বিএনপির কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করছেন দলের অনেকেই। 

সূত্র জানায়, পঁচাত্তরের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। রাজধানীর রমনা রেঁস্তোরায় সেদিন এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘোষণাপত্র পাঠ ছাড়াও প্রায় দুই ঘণ্টা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। তখন একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত, ভঙ্গুর ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশকে টেনে তোলার দু:সাহসিক দায়িত্ব গ্রহনের মধ্য দিয়ে যিনি রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছিলেন। এরপর রাষ্ট্র গঠনে তার নিরন্তর ছুটে চলা, নিরলস শ্রম আর নি:সীম স্বপ্ন তাকে অমরত্ব দান করে। পৃথিবীর ইতিহাসে যার স্থান হয় ক্ষণজন্মা অথচ ভিশনারী লিডার হিসেবে। ১৯৭৮ সালের এইদিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে জন্ম হয় দেশের বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটির। প্রতিষ্ঠাকালে দলের অন্যতম সৌন্দর্য ছিলো ডানপন্থী, বামপন্থী, মধ্যপন্থী সবার অংশগ্রহণ। সেদিন তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, বাস্তবিক পক্ষে জাতীয় প্রয়োজনের জন্যই নতুন দল করা হচ্ছে, এই দল জাতিকে দৃঢ় করবে এবং দেশ ও দেশের মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তারই হাত ধরে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় গণমুখী রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়।

প্রেসিডেন্ট জিয়া সে সময় বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা এনেছি। অনেকে তখন মনে করেছেন, এই স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। কিন্তু স্বাধীনতার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব। বিপুল জাতীয় সম্পদ রয়েছে তার সদ্ব্যবহার করলে অল্প সময়ের মধ্যে দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এই বিশ্বাস নিয়েই আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমি দেখেছি হাজার হাজার নরনারী দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। তারে ভুললে চলবে না, প্রশ্ন করতে হবে কেন তারা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাদের আস্থা, দেশ স্বাধীন হলে তারা শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। তাদের সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই নতুন দলের অঙ্গীকার।

বাংলাশেকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, বিশ্বে দ্রুত অগ্রসরমান দেশ হিসেবে যখন বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছিল ঠিক তখনই দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অংশ হিসেবে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারান বাংলাদেশের ইতিহাসের ক্ষণজন্মা এই রাষ্ট্রনায়ক।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর ১৯৮২ সালে দেশ ও গণতন্ত্রের অপরিহার্য প্রয়োজনে দলের হাল ধরেন তারই সহধর্মিণী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সাধারণ গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। সে সময় বিএনপি অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় সঙ্কট মোকাবিলায় অনেকটা বেসামাল ছিল। তবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীন নেতৃত্ব ও সীমাহীন ধৈর্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে দলটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান প্রবাহমান নদীর মতো। সামরিক শাসক এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে তিনি পরিচিতি লাভ করেন ‘আপোসহীন নেত্রী’ হিসেবে।

প্রতিষ্ঠার পর নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছে বিএনপি। দেশীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেমনি দলটিকে নি:শ্বেস করতে চেয়েছে তেমনি বিদেশী শক্তিও কখনো কখনো দলটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। মধ্যপন্থার উদারণৈতিক এই দলটি অতি অল্প সময়ে দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করায় বারবারই চক্রান্তের শিকার হয়েছে। যদিও সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের জাল ছিন্ন করেই দুর্বার গতিতে বিএনপি এগিয়ে চলেছে। 

বিশেষ করে কুখ্যাত ওয়ানইলেভেন সরকার দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব সাবেক তিন বারের সফল প্রধানমনন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারপুত্র তারেক রহমানকে মাইনাস করার অপচেষ্টা করে। আদালতকে ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগও বারবার বিএনপিকে ধংসের পায়তারা করেছে। তারা ভেবেছিলো জেলজুলুম আর নির্যাতন করে বিএনপিকে এদেশের রাজনীতি থেকে মুছে ফেলবে। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং ঘাতপ্রতিঘাতে দলটি হয়েছে আরো জনপ্রিয়, আরো সুসংগঠিত। দুদিনে-দু:সময়ে দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মীই বরং বিএনপিকে আগলে রেখেছে। নিজেরা জেলজুলুম, হামলা-মামলা আর রাজনৈতিক সংঘাত সয়ে রাজপথে টিকিয়ে রেখেছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটিকে। 

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির অবদান কম নয়। হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লাগাতার সংগ্রামরত দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মী মধ্য জুলাই থেকে রাজপথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। দেশ নায়ক তারেক রহমানের নির্দেশে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে একটি ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন ঘটাতে দলটির নেতাকর্মীদের যে ত্যাগের নজির দেখিয়েছেন তা এদেশের মুক্তিকামী মানুষ স্মরণ করবে। দলটির শতশত নেতাকর্মীর আত্মাহুতি আর ত্যাগ চব্বিশের গণবিপ্লবকে মহিমান্মিত করেছে। 

প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫ দশকে এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র-ভোটাধিকারসহ উন্নয়নের কথা বলে গণমানুষের মুখপাত্র হিসেবে বিএনপি নিজেকে প্রমান করেছে। দেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি কানায় কানায় এই দলটির কর্মী-সমর্থকে পরিপূর্ণ। ছাব্বিশের নির্বাচনে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেন দলটি প্রতিষ্ঠার সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের প্রয়োজন এবং মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের যে মহান ব্রত নিয়ে বিএনপির যাত্রা শুরু হয়েছিলো আজ তারই পবিত্র উত্তরাধিকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব যেন সেই পথেরই পথিক। রাষ্ট্র সংস্কারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রণীত ৩১ দফা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। 

এদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রায় ৭ মাস হতে চললেও এখনো অনেক নেতাকর্মী চরম হতাশায় ভুগছেন। বিশেষ করে মামলা, হামলা, গ্রেফতার আর জেলজীবন ছিল যাদের নিত্যসঙ্গী। তাদের কারও শরীরে এখনো গুলির দাগ, গভীর ক্ষত। কেউ হারিয়েছেন প্রিয়জন, কেউ শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে টিকে ছিলেন সংগ্রামে। আতঙ্কে অসংখ্য রাত কেটেছে ধানখেতে, খোলা আকাশের নিচে, সুপারি বাগানে আবার কখনো কবরস্থানে। প্রত্যাশা ছিল-দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হলে একদিন মিলবে ত্যাগের স্বীকৃতি। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে, ক্ষমতায় এসেছে নিজেদের দল বিএনপি। কিন্তু তৃণমূলের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর অভিযোগ-তাদের ভাগ্য বদলায়নি। বরং বঞ্চনার কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে। ত্যাগ আছে, কিন্তু মূল্যায়ন কোথায়? এই প্রশ্ন এখন দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাদের মুখে মুখে। 

অপরদিকে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে প্রায় দেড় লাখ মামলায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে বলে দাবি বিএনপির। কারও কারও বিরুদ্ধে জমেছে মামলার পাহাড়।

দলটির নেতারা জানান, হাসিনা সরকারের সময়ে কারাগারে ও রিমান্ডে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছেন অনেকে। একটা সময় আদালতের বারান্দা হয়ে উঠেছিল তাদের জীবনের বড় অংশ। এমনও ঘটনা ঘটেছে, মূল ব্যক্তিকে না পেয়ে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেকে গুম হয়েছেন, আবার নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিএনপির রাজনীতি করার কারণে কারাগারের কনডেম সেলেও রাখা হয়েছিল অনেক নেতাকর্মীকে। আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কারও হয়েছে অঙ্গহানি। আবার কেউ শরীর ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন অসহনীয় যন্ত্রণা। বাড়িঘর, জমিজমা, এমনকি গবাদি পশুও বিক্রি করে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। কেউ কেউ ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়েও আন্দোলনের খরচ জুগিয়েছেন।

অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন, আন্দোলনের সময় যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তারাই এখন প্রভাবশালী। আর যারা জীবনবাজি রেখে রাজপথে ছিলেন, তারা অবহেলিত। কেউ কেউ সরাসরি দলের কাছে ত্যাগের স্বীকৃতি দাবি করছেন। তাদের মতে, শুধু ক্ষমতায় আসাই শেষ কথা নয়, যারা এই পথ তৈরি করেছেন, তাদের মূল্যায়ন না হলে দলীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে।

নেতাকর্মীরে মতে, এই দীর্ঘ ত্যাগ ও কষ্টের পেছনে ছিল একটাই স্বপ্ন-দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হলে তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন হবে। দল তাদের পাশে দাঁড়াবে, দেবে যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করছেন অনেকেই। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী এখনো উপেক্ষিত। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নতুনভাবে যুক্ত হওয়া বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীই দখল করে নিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। এতে হতাশা বাড়ছে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে। বিএনপির যুগ্মমহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলও এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। সাড়ে চারশ মামলার আসামি হিসাবে দীর্ঘ সময় আদালত ও কারাগারে কাটিয়েছেন তিনি। প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তার অনুসারীদের প্রত্যাশা ছিল-গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি এমপি, মন্ত্রী, মেয়র কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে মূল্যায়িত হবেন। তবে কোনোটিই ঘটেনি।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল তিন শতাধিক মামলার আসামি। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলন জোরালো করতে নেতাকর্মীদের নানাভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। পিকেটিংসহ প্রতিটি মিছিল, মিটিংয়ে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। বেশ কয়েকবার রাজপথ থেকে গ্রেফতারও হন। রিমান্ডে তার ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। রাত কাটিয়েছেন কারাগারের কনডেম সেলে। একদিকে রিমান্ডে নির্যাতন, অন্যদিকে কারাগারে বিনা চিকিৎসায় তার একটি কিডনি অকেজো হলে ফেলে দেওয়া হয়। ২০১০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মালিবাগে হরতাল চলাকালে বিএনপির শান্তিপূর্ণ মিছিলে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে ৪ জন নিহত হন। ওই সময় মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গুলিবিদ্ধ হন। তার মেরুদন্ডে দুবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন গুলির সেই ক্ষত। মায়ের মৃত্যুর সময় ছিলেন কারাগারে। মৃত্যুর ৩ দিন পর ৮ ঘণ্টা প্যারোলে রংপুর থেকে বরিশালে নেওয়া হলেও মায়ের মুখ আর দেখতে পারেননি তিনি। আলালের সাড়ে ৩ বছর সাজার রায় দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতেও কারাগার থেকে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নানা বার্তা দিতেন নেতাকর্মীদের। অভু্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাকেও এমপি, মন্ত্রী কিংবা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে চেয়েছেন নেতারা। এত ত্যাগের পরও তাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ।

এছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল, যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, সাবেক সভাপতি রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণের মতো হাজারো ত্যাগী নেতার যথার্থ মূল্যায়ন চান দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাশেদ রহমান বলেন, ফ্যাসিষ্ট হাসিনা পতনের পর বিএনপির কাছে জনগণের পাহাড়সম প্রত্যাশার মধ্যে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পপনাগুলো দৃশ্যপট হওয়া। তিনি বলেন,  বাংলাদেশে রাজনৈতিক গৎবাধা সিস্টেম পরিবর্তন অতীব জরুরী। অযোগ্যতা পরিহার আর ভালো কাজের পুরস্কার জনগনের প্রত্যাশা পুরনে সহায়ক হবে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির ৫ দিনের কর্মসূচি

এদিকে বাংলাশে জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। এর আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এতে দলের যুগ্ম মহাসচিব, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক-সদস্য সচিব এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়কসহ সিনিয়র নেতারা অংশ নেন।

সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। সেখানে তিনি ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।’ আগামী ৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতি বছরের মতো এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। এছাড়া উপযুক্ত দিনে মৎস্য অবমুক্তকরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হবে। মৎস্য অবমুক্তকরণ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেবেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। আর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেবেন দলের যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। উপযুক্ত দিনক্ষণ নির্ধারণ করে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।


মন্তব্য