গ্যাস সংকটের চাপ তরল জ্বালানিতে, বাড়ছে ভর্তুকির বোঝা
- কামরুজ্জামান বাবলু
- প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৭ PM , আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৭ PM
লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার কারেণ বাসাবাড়ি ও অফিসে ঘন ঘন জেনারেটর চালু, সিএনজি ফিলিং স্টেশনে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকা ও শিল্প কারখানায় গ্যাসের সংকট সামাল দিতে গিয়ে তরল জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে একদিকে ভর্তুকির হিসাব বড় হচ্ছে অন্যদিকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে তরল জ্বালানির চাহিদা।
এই পরিস্থিতিতে একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনে ভর্তুকির বোঝা বেড়েই চলছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ভর্তুকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি।
বিপিসির বিপণন শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট তিন লাখ ২৩৩ টন ডিজেল বিক্রি হয়েছিল। চলতি বছরের আগস্ট সেই বিক্রি ২৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে তিন লাখ ৮৬ হাজার ৩৫৩ টনে দাঁড়িয়েছে। অকটেনের বিক্রি ২০২৫ সালের আগস্টে ছিল ৩৪ হাজার ৩৩৬ টন। এই বিক্রি চলতি বছরের আগস্টে ২৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার ৬৫ টন। তবে সেই তুলনায় পেট্রোলের বিক্রি অতটা বাড়েনি। আগের বছর আগস্টা পেট্রোলের বিক্রি ছিল ৩৩ হাজার ৯৫৪ টন যা চলতি বছরের আগস্টে হয়েছে ৩৫ হাজার ৬৭৪ টন। অর্থাৎ পেট্রোলের বিক্রি ৫ শতাংশ বেড়েছে যা প্রতিবছরই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বেড়ে থাকে।
এই সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি ফার্নেস তেলের বিক্রিতেও বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। আগের বছর আগস্টে সরকারি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ৫৫ হাজার ৯২৫ টন ফার্নেস তেল বিক্রি হয়েছিল। আর চলতি বছর আগস্টে বিক্রি হয়েছে এক লাখ ৪৩ হাজার ৮৯৯ টন ফার্নেস তেল। অর্থাৎ গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে এই মাসে ১৫৭ শতাংশ (আড়াইগুন) ফার্নেস তেল বেশি খরচ হয়েছে।
বিপিসির নতুন চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাংলাকন্ঠকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে প্রচুর ভর্তুকি দিয়ে বাজারে জ্বালানি সরবরাহ করতে হচ্ছে। বর্তমানে এক লিটার ডিজেল কিনতে সরকারকে ১৯৬ টাকা করে খরচ করতে হচ্ছে। আর সেটা বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ১১৫ টাকায়। এভাবে ভর্তুকি দিতে গিয়ে ইতোমধ্যেই ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়েছে।
তবে তেলের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই বলে জানায় বিপিসি। সংস্থাটির চেয়ারম্যান বলেন, পরিস্থিতি যাই হোক বিশ্ববাজার থেকে পর্যাপ্ত তেল কিনে সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বিপিসি।
.jpg?1789473721721)
সরকার গত ছয় মাসে দুই দফায় তরল জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করে। ডিজেলে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল লিটারে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়। পরের ধাপে মে মাসে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। বর্তমানে পেট্রোল প্রতিলিটার ১৪০ টাকা, অকটেন প্রতি লিটার ১৪৫ টাকা, ডিজেল প্রতিলিটার ১১৫ টাকা এবং কেরোসিন প্রতিলিটার ১৩৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিবেশি দেশ ও উন্নত দেশগুলোতে আরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেল। গত আগস্টে ডিজেল ভারতে প্রতিলিটার ১২৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা, মিয়ানমারে ১৫৯ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, পাকিস্তানে ১৭৪ টাকা এবং শ্রীলংকায় ১৭৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ১৭৮ টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২০৩ টাকা, যুক্তরাজ্যে ৩০৩ টাকা, ফ্রান্সে ৩১৪ টাকা, জার্মানিতে ৩২৫ টাকা এবং সিঙ্গাপুরে ৩৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
সক্রিয় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: দেশে সরকারি মালিকানাধিন ১৫টি এবং বেসরকারি মালিকানার ৪১টি ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়া এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বার বার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সরকার ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি কেন্দ্রেগুলোর ১১৭৮ মেগাওয়াট এবং বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর ৫৫৪১ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।
দেশে গরমের মওসুমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পেক্ষাপটে বিদ্যুৎকেন্দ্রেগুলোতে তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে উৎপাদন জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সাধারণত তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ১৫০০ থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকলেও গত একমাস ধরে তেল পাওয়া সাপেক্ষে তিন হাজার থেকে চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারের কাছে কেন্দ্রগুলোর বকেয়া ও তেলের যোগান না থাকার কারণে উৎপাদন আর বাড়ানো যাচ্ছিল না।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন বিপপার, সভাপতি ডেভিড হাসনাত বাংলাকণ্ঠকে বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই বেশ কিছু বকেয়া পরিশোধ করেছে। এসব টাকা দিয়ে ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মলিকরা ফার্নেস অয়েল আমদানির এলসি খুলেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেই তেল দেশে আসলে উৎপাদন সাড়ে চার হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াটে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
গ্যাস সরবরাহে টান: টার্মিনালে আগুন, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির কয়েকটি এলএনজি কার্গো সময় মতো না আসা, পুরোনো মডেলের কার্গো টার্মিনালের সঙ্গে সঠিকভাবে নোঙ্গর করতে না পারাসহ নানা কারণে আগস্টে পরিকল্পনার ১০টি কার্গো থেকে চারটিই আসতে পারেনি। ফলে ছয় কার্গো এলএনজি দিয়ে স্বল্প সক্ষমতায় মাসটি পার হয়েছে। অর্থাৎ এলএনজি থেকে গ্যাসের সরবরাহ ৪০ শতাংশ কম ছিল। সব মিলিয়ে মাসটিতে সারাদেশে গ্যাসের ব্যাপক ভোগান্তি গেছে যা এখনও পুরেপুরি দূর হয়নি। ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সাধারণ ২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ থাকলেও আগস্টে তা ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে।